পিপলু মারমা, বান্দরবান
দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি বান্দরবানে রুমা ও থানচি উপজেলা পর্যটকদের জন্য সীমিত পরিসরে উন্মুক্ত করা হয়েছে। প্রায় ২৩ মাস ধরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে আরোপিত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে এই দুটি উপজেলা আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠছে দিন। অবারিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে রুমা ও থানচি বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে আবার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে প্রস্তুত।
তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বান্দরবান জেলার এই দুটি উপজেলা প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। মেঘে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া, সবুজে মোড়া অরণ্য, রহস্যময় গুহা, আর কলকল ধ্বনিতে বয়ে চলা ঝর্ণাধারা পর্যটকদের মন জুড়িয়ে দেয়। রুমা উপজেলার বগালেক, কেউক্রাডং, মুনলাই পাড়া, রিজুক ঝরনা, এবং থানচির তমা তুঙ্গী, নাফাখুম, অমিয়াকুম, ভেলাখুম, সাতভাই কুম, ডিম পাহাড় ও শঙ্খ নদীর সৌন্দর্য পর্যটকদের বিমোহিত করে। এখানকার নির্মল বাতাস এবং বুনো পরিবেশে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ।
এছাড়া জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য রুমা ও থানচি উপজলায় মারমা, ত্রিপুরা, বম, ম্রো সহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। তাদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপনের পদ্ধতি এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাক পর্যটকদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে। কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতিকে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যে। যা পর্যটনকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এছাড়াও যারা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাদের জন্য রুমা ও থানচি আদর্শ গন্তব্য স্থল । দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে ট্রেকিং, কায়াকিং, পাহাড়ি ঝর্ণায় গোসল এবং স্থানীয় জীবন যাত্রা উপভোগ করার সুযোগ এখানে রয়েছে। নাফাখুম ঝর্ণা, বগালেক এবং কেউক্রাডং ট্রেকিং রুটগুলো অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় ও রোমাঞ্চকর।
কিন্তু দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থানীয় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুলো মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন এবং গাইড সেবার সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিল। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে আবারও এসব খাতে প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে। স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট মালিক, ট্যুরিস্ট গাইড, পরিবহন শ্রমিক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রা নতুন করে আশার আলো দেখছেন। পর্যটকদের আগমনে এলাকার অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই অপার সম্ভাবনা কে কাজে লাগাতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নিরাপত্তা সংকট এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যকলাপ পর্যটকদের মনে এক ধরনের ভীতি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ রূপে স্বাভাবিক করা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্রশাসনের মূল লক্ষ্য বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এছাড়া, পর্যটন অবকাঠামো (যেমন - উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যটক বান্ধব আবাসন, প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা) আরও উন্নত করা। এবং কমিউনিটি ট্যুরিজম এর ব্যবস্থা করা এবং স্থানীয়দের পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে টেকসই পর্যটন নীতি গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন সচেতন মহল।
তাই পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে আশাবাদী যে, সরকারের সঠিক পদক্ষেপ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় রুমা ও থানচি অচিরেই দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতিতে এক বিশাল অবদান রাখবে।
