ভালো বেতনে ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। তবে ফ্রান্সের বদলে ভুক্তভোগীদের পাঠানো হয় নেপাল ও কেনিয়ায়। সেখানে জিম্মি করে আদায় করা হয় মুক্তিপণ। শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন ছয় ভুক্তভোগী। এ ছাড়া নাসির উদ্দিন নামের আরেকজনের যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি তাঁর। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ায় সেখান থেকে ফিরে আসেন তিনি।
ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি জমি, পরিবারের নারী সদস্যদের গহনা, এমনকি ভিটেমাটি বিক্রি করে সাতজনকে ইউরোপে পাঠানোর জন্য টাকা পরিশোধ করে তাঁদের পরিবার। এখন ভুক্তভোগীরা খালি হাতে ফিরে আসায় বিপাকে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। একদিকে পাওনাদারদের চাপ, অন্যদিকে সহায়-সম্বল বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তাঁরা।
ফ্রান্সে মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখানো হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোর জেলার বহু যুবককে। সেই স্বপ্নের পরিণতিতে নেপাল ও আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় বন্দিদশায় নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নাটোরের অন্তত সাতজন ভুক্তভোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাঁরা প্রতারণার শিকার হন। ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইউরোপের জাল ভিসা ও বিমানের জাল টিকিট দিয়ে তাঁদের খালি হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কেনিয়াফেরত এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘স্ত্রীর গহনা, নিজের জমানো টাকা, গরু, ভিটাবাড়ি—সব বিক্রি করে ২৬ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলাম দালালের হাতে। ভেবেছিলাম, ইউরোপে গিয়ে সব কষ্ট মুছে যাবে। কিন্তু ফ্রান্সে না পাঠিয়ে প্রথমে নেপাল, পরে কেনিয়ার এক অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখে সাড়ে চার মাস। বুটের লাথিতে হাঁটু ও পায়ের হাড় অচল হয়ে গেছে। লাঠি আর অস্ত্রের মুখে দেশে ফোন করিয়ে বলেছে, “বল, আমরা ভালো আছি।” দেশে ফিরে এখন আমি একেবারে পথের ফকির। পাওনাদার আর কিস্তির ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়।’
অভিযুক্তদের টাকা নেওয়ার ছবি, জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে টাকা নেওয়ার অঙ্গীকারনামা, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরের রসিদ, ফ্রান্সের জাল ভিসা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভিএফএস গ্লোবালের ভুয়া রসিদ এবং ভুক্তভোগীদের পাসপোর্টে থাকা নেপাল ও কেনিয়ার ইমিগ্রেশন সিলসহ বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে চক্রের সদস্যদের সঙ্গেও। তাঁরা টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও জাল ভিসা দেওয়া ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয় যেভাবে
চক্রের সঙ্গে জড়িতদের একজন রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার হাতনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আহসান হাবিব। তাঁর বড় ছেলে মেহেদী হাসান চক্রের টেকনিক্যাল মাস্টারমাইন্ড। তিনি ইউরোপের জাল ভিসা, জাল ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স ও ভুয়া বিমান টিকিট তৈরিতে পারদর্শী বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আহসান হাবিব।
ভিসা ও টিকিট তৈরি প্রসঙ্গে মেহেদী বলেন, ‘আমি তাদের কোনো ভুয়া ভিসা ও বিমানের টিকিট বানিয়ে দিইনি। এগুলো তারা নিজেরাই তৈরি করেছে।’
চক্রের আরেক হোতা চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০ নম্বর আলাতুলি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্য সহকারী মো. আবু সাইম। তিনি আহসান হাবিবের ভায়রা ভাই। তাঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করেন মো. হাবিবুর রহমান।
মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি লোকজন খুঁজে বের করেন আবু সাইম ও মো. হাবিবুর রহমান। তাঁরাই যুবকদের প্রলুব্ধ করে তাঁদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করতেন। কিছু ক্ষেত্রে চুক্তি করা হতো। এমন কয়েকটি চুক্তিপত্র পাওয়া গেছে। লেনদেনের বেশির ভাগই আবু সাইমের স্ত্রী নুসরাত মহলের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করা হয়।
লেনদেন প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান বলেন, ‘সরাসরি কেউ আমার সামনে এসে টাকা দেয়নি। লেনদেন যা হয়েছে, তা মূলত খালুর (আবু সাইম) মাধ্যমে হয়েছে। যাকে দিয়ে ইউরোপে লোক পাঠানোর কাজ করছিলাম, তাকে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা দেওয়ার পর সে বিদেশে মারা যায়। পরে আরেকজনের মাধ্যমে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু সে আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। এখানে আমিও প্রতারিত হয়েছি।’
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফ্রান্সে এক বছর মেয়াদি কাজের ভিসার কথা বলে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে চক্রটি। ইউরোপে না পাঠিয়ে প্রথমে ট্যুরিস্ট ভিসায় নেপালে নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে ট্রানজিট ও ফ্যাক্টরিতে কাজ দেওয়ার কথা বলে কেনিয়ায় নিয়ে একটি কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়।
অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এমনকি দিনের পর দিন তাঁদের খাবার দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। কেনিয়ার গোপন টর্চার সেলে জিম্মি করে দফায় দফায় স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
নির্যাতনের অভিযোগ প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান বলেন, ‘সেখানে তাদের কোনো নির্যাতন করা হয়নি। তারা নিজেদের মতো রুম ভাড়া নিয়ে রান্না করে খেত। তাদের থাকা-খাওয়া ও রুম ভাড়ার পেছনে নিজের পকেট থেকে চার লাখ টাকা খরচ করেছি। মারধরের যেসব কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
তথ্য অনুযায়ী, মো. নাসির উদ্দিন, মো. সাকিল, নিশান, ওয়ালিদ, আব্দুল মালেক, আব্দুল কাদের ও বাদশা নামের সাতজনের কাছ থেকে সব মিলিয়ে অন্তত দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। সর্বস্ব হারিয়ে দেনার দায়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে।
চক্রের ভয়ে এবং অভিযোগ করলে টাকা ফেরত পাওয়ার শেষ আশাটুকুও নষ্ট হয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় মুখ খুলতে চান না কেউ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘সাড়ে চার মাস নির্যাতন সহ্য করার পর ভুয়া কাগজসহ খালি হাতে আমাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। পাসপোর্টে শুধু নেপাল ও কেনিয়ার ইমিগ্রেশন সিল ছাড়া ফ্রান্সের কোনো কাজের ভিসা ছিল না। আজ আমরা পথের ফকির। দেশে ফিরে আমি সাইমের বাড়িতে গিয়েছি, তাকে পাইনি। আর আহসান মাস্টারের কাছে গেলে সে বলে, আমি তো কারও থেকে টাকা নিইনি। আমি কিছু জানি না। আমরা এদের কঠোর শাস্তি এবং আমাদের টাকা উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।’
যা বলছেন অভিযুক্তরা
টাকা ফেরত ও বিচার পেতে গত আগস্টে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিচারিক আদালতে মামলা করেন ভুক্তভোগী আব্দুল কাদেরের স্ত্রী মোছা. ইসরাত জাহান নিসা। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর থানায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী কল্যাণ আইনের বিভিন্ন ধারায় নিয়মিত মামলা হয়। পুলিশ তিন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (নং-৪৩৯) দাখিল করে। মামলায় আবু সাইমকে ১ নম্বর, তাঁর স্ত্রী নুসরাত মহলকে ২ নম্বর এবং হাবিবুর রহমানকে আসামি করা হয়।
স্বাস্থ্য সহকারী মো. আবু সাইমকে বরখাস্ত ও তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ভুক্তভোগীরা। অভিযোগের বিষয়ে জানতে আবু সাইমের তিনটি নম্বরে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সবগুলো নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর স্ত্রী নুসরাত মহলের মোবাইলে কল দিলে প্রথমে বলা হয়, আবু সাইম বাসায় নেই। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি ফোন কেটে দেন। এরপর আর ফোন রিসিভ করেননি।
আহসান হাবিবের ছেলে মেহেদী হাসান বলেন, ‘এটা সত্য, আমি টাকা নিয়েছি। টাকা নিয়ে পালিয়ে যাইনি, বাংলাদেশেই আছি। এখানে কোনো জাল-জালিয়াতির বিষয় নেই। যারা অভিযোগ দিয়েছে, তারা সবাই আমার পরিচিত, বাইরের কেউ না। তাদের সঙ্গে ফ্রান্স পর্যন্ত পৌঁছানোর কথা হয়েছিল। প্রসেসিংয়ের অংশ হিসেবে প্রথমে নেপাল এবং পরে কেনিয়া নেওয়া হয়েছিল।’
ঢাকায় ফ্রান্সের দূতাবাস থাকা সত্ত্বেও নেপাল ও কেনিয়ায় কেন নেওয়া হলো—এমন প্রশ্নে মেহেদী হাসান বলেন, ‘প্রথমে নেপালে অবস্থিত ফ্রান্স দূতাবাসে তাদের সাক্ষাৎকারের কথা ছিল। কিন্তু সেখানে তা সম্ভব হয়নি। পরে কেনিয়া থেকে ফ্রান্স দূতাবাস ফেস করানোর চেষ্টা হয়েছিল। তবে সেখান থেকেও সম্ভব হয়নি। পরে তাদের ফিরিয়ে এনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ঢাকায় ফ্রান্সের ভিএফএস সেন্টারে পাঁচজনের পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে।’
টাকা ফেরত দেওয়ার প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি অন্য জায়গায় প্রতারিত হলেও প্যাসেঞ্জারদের টাকা ফেরত দেওয়া আমার দায়িত্ব। কারও টাকা মেরে খাব না। ইতিমধ্যে আমার ফুফাতো ভাই নিশান এবং আব্দুল মালেক নামের একজনকে গোদাগাড়ীর জমি-বাড়ি লিখে দিয়েছি। নাসির ভাই ও কাদেরসহ বাকিদের পাওনা মেটানোর জন্য এক-দুই মাসের মতো সময় দিলে পর্যায়ক্রমে সব টাকা বুঝিয়ে দেব। প্রতারণার ইচ্ছা থাকলে তো এভাবে নিজের জমি লিখে দিতাম না।’
তবে নিজে কার মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি মেহেদী হাসান।
মেহেদী হাসান আব্দুল মালেককে গোদাগাড়ীর জমি-বাড়ি লিখে দেওয়ার কথা বললেও এর সত্যতা মেলেনি। ভুক্তভোগী আব্দুল মালেক জানান, তিনি টাকা ফেরত পাননি। জমি-বাড়ি লিখে দেওয়ার দাবিও সঠিক নয়।
