রান্নার গ্যাস এখন বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারের নিত্যদিনের অপরিহার্য দ্রব্য। শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে।
রান্নার গ্যাস এখন বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারের নিত্যদিনের অপরিহার্য দ্রব্য। শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্রই এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সংখ্যা বাড়ছে। অথচ এ অপরিহার্য পণ্যটির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহসংকট, অতিরিক্ত দামে বিক্রি এবং বাজারজুড়ে অনিয়ম সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। রান্নার গ্যাস কিনতে গিয়ে মানুষ যদি একদিকে বাড়তি অর্থ গুনতে বাধ্য হয়, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময় সিলিন্ডারই না পায়, তবে তা নিছক বাজারের সমস্যা নয়; এটি জনস্বার্থ ও বাজার ব্যবস্থাপনার গুরুতর সংকট। গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ ব্যবস্থার যেকোনো পর্যায়ে অনিয়ম, সমন্বয়হীনতা কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে তার সরাসরি মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট তীব্র হচ্ছে। দোকানে দোকানে খুঁজেও মিলছে না সিলিন্ডার। কোথাও পাওয়া গেলেও বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দামে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে কক্সবাজারে ২ হাজার ২০০ টাকা, নরসিংদীতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং কিশোরগঞ্জে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের। খবরে বলা হয়, গত ৪ অক্টোবর বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬৬৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে ।
এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহ সংকটের সমাধান ও কমিশন বৃদ্ধির দাবিতে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারাদেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা। এতে বাজারের অস্থিরতা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে জ্বালানিমন্ত্রীর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির পর এলপিজির দোকান বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এর পরও বাজারে কতটা পরিবর্তন আসে সেটাই দেখার বিষয়।
এলপিজির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষিত দাম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাগজে-কলমে নির্ধারিত মূল্য আর বাজারে বাস্তবে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান থাকলে সে মূল্য নির্ধারণের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কোনো সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, সরবরাহের ঘাটতি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে কি না এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা ঘোষিত মূল্য মানছেন কি না—এসব বিষয় নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা জরুরি। সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না— এমন পরিস্থিতিতে অসাধু ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়। সরবরাহ কমে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে অনেক ভোক্তা বাধ্য হয়ে বেশি দামেও গ্যাস কিনতে চান। এ অসহায়তাকে পুঁজি করে কেউ মজুতদারি করলে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে কিংবা নির্ধারিত দামের বাইরে অর্থ আদায় করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাজার তদারকির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি। দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকারি ও খুচরা বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, মজুতের তথ্য যাচাই, বিক্রয়মূল্য প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা এবং ভোক্তাদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। রান্নার গ্যাস কোনো বিলাসপণ্য নয়; এটি দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত। তাই এ নিয়ে সংকট তৈরি হলে তার সমাধানও হতে হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক। সরকারকে একদিকে পরিবেশকদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করতে হবে, অন্যদিকে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদেরও মনে রাখতে হবে, ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষা করে কোনো বাজারব্যবস্থা দীর্ঘদিন টেকসই হতে পারে না।
আমরা মনে করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক করবে, অনিয়ম বন্ধ করবে এবং মূল্য কমাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। রান্নার গ্যাসের বাজারে নৈরাজ্য চলতে দেওয়া যায় না। সাধারণ মানুষ যেন ন্যায্য দামে প্রয়োজনীয় সিলিন্ডার কিনতে পারে—এ নিশ্চয়তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে আর বিলম্ব কাম্য নয়। রান্নার গ্যাস নিয়ে নৈরাজ্য বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
