রংপুরে অবস্থিত গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি (কারুপণ্য) জিতেছে স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ’। নারী শ্রমিকদের কল্যাণ, পরিবেশবান্ধব নকশা এবং কর্মক্ষেত্রে মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার অনন্য উদ্যোগের স্বীকৃতিস্বরূপ কারখানাটিকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টস (রিবা) এ পুরস্কারের জন্য গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির নাম ঘোষণা করে। বিচারকদের ভাষায়, ভবনটি ‘নীরব বিনয়ের এক অনন্য নিদর্শন’।

রংপুর শহরে অবস্থিত সাততলা এ কারখানার আয়তন ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটেরও বেশি। বাংলাদেশের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের নকশায় নির্মিত ভবনটিতে কর্মপরিবেশের সঙ্গে প্রকৃতিকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করা হয়েছে। সবুজে ঘেরা বারান্দা, ছায়াঘেরা উঠান, পুকুরপাড়ের হাঁটার পথ এবং গাছপালায় আচ্ছাদিত দেয়াল ভবনটিকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী রূপ।
২০১৭ সালে কারখানাটির কার্যক্রম শুরু হয়। তবে করোনা মহামারিসহ বিভিন্ন কারণে রিবার বিচারকদের সরেজমিনে পরিদর্শন করতে এ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
নারী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা
কারখানাটিতে প্রায় ৫ হাজার কর্মী কাজ করেন, যাঁদের অধিকাংশই নারী। কর্মীদের জীবনমান ও কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে এখানে রাখা হয়েছে ছাদে শিশুদের দিবাযত্ন কেন্দ্র, চিকিৎসাসেবা এবং সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য ছায়াঘেরা জায়গা। কারখানার প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছে এক নারীমূর্তি। স্থপতিদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি নারীর ক্ষমতায়ন ও শক্তির প্রতীক। ভবনটির সাতটি তলার মধ্যে চারটি তলায় বস্ত্র ও কার্পেট তৈরির কাজ হয়। অন্য তলাগুলোতে পণ্য প্যাকেজিং এবং গুদামজাতকরণের ব্যবস্থা রয়েছে।

রিবার মতে, কারখানাটির সুযোগ-সুবিধা শুধু কর্মঘণ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্মীরা অনেক সময় কাজের বাইরেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসব সুবিধা ব্যবহার করেন। প্রতিষ্ঠানটি কারখানার প্রচলিত নকশা ও পরিচালনব্যবস্থার বিকল্প একটি মানবিক মডেল তুলে ধরেছে।
শ্রমিক-মালিকের বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ
কারখানাটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর প্রধান প্রবেশপথ। বাংলাদেশে অনেক বড় কারখানায় শ্রমিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ থাকলেও গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরিতে শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিক সবাই একই প্রধান প্রবেশপথ ব্যবহার করেন।
রিবার বিচারক প্যানেলের সভাপতি বিজয় জৈন তাঁর মূল্যায়নে এই প্রবেশপথকে ‘সমতার ভিত্তিতে সবার জন্য উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ভবনটির নকশা প্রচলিত সামাজিক স্তরবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ এম. খন্দকারের লক্ষ্য ছিল, শিল্পকারখানাও যে মানুষকে স্বস্তি দিতে, পরিচর্যা করতে এবং অনুপ্রাণিত করতে পারে, তা প্রমাণ করা।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি সহজ প্রশ্ন তুলেছিলাম যে মানুষগুলো একটি কারখানায় কাজ করেন, তাঁদের জন্য কারখানাটিকে প্রথমেই একটি বাড়ি হিসেবে নকশা করা হলে কেমন হতো? প্রতিটি উঠান, বাগান, জলাধার ও ছায়াঘেরা বারান্দার পরিকল্পনা সেই প্রশ্ন থেকেই এসেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কারখানা এমন কোনো যন্ত্র হওয়া উচিত নয়, যা মানুষের শক্তি নিঃশেষ করে দেয়। বরং এটি এমন একটি জীবন্ত জায়গা হওয়া উচিত, যা মানুষকে নতুন শক্তি জোগায়।’

বাংলাদেশের পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে ভিন্ন দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশ। তবে এ খাতের কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৩ সালে ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারে রানা প্লাজা ধসে প্রায় ১ হাজার ১০০ মানুষের মৃত্যু হয়। ভবনটিতে একাধিক পোশাক কারখানা ছিল। ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের কাজে ফিরতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কারখানার নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার গুরুত্ব নতুন করে সামনে আনে।
এ প্রেক্ষাপটে গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির নকশায় শ্রমিকদের সুস্থতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
কারখানাটি পরিচালনা করে করুপান্না রংপুর লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি হাতে তৈরি কার্পেটের পাশাপাশি দরজার পাপোশ ও গোসলখানায় ব্যবহারের ম্যাটসহ বিভিন্ন বস্ত্রপণ্য তৈরি করে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাফল্য
রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া চারটি স্থাপনার মধ্যে বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প ছিল। গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির পাশাপাশি তালিকায় ছিল ঢাকার জলবায়ু-উপযোগী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। বাকি দুটি প্রকল্প বেলজিয়ামের একটি ১৯৬০-এর দশকের অফিস ভবনের সংস্কার এবং অন্যটি সম্প্রসারিত একটি শিল্পকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
২০১৬ সালে প্রবর্তিত রিবা ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজকে বিশ্বের একক ভবনের জন্য দেওয়া অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্থাপত্য পুরস্কার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উদ্ভাবনী চিন্তা, দূরদর্শী নকশা এবং স্থাপত্যের উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসেবে সাধারণত দুই বছর পরপর এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
এর আগে ২০২৪ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় ছয়তলা কাঠের তৈরি সামাজিক আবাসন প্রকল্প এ পুরস্কার জিতেছিল। আগের বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের গ্রামীণ এলাকার একটি বিদ্যালয়, পেরুর একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের প্রত্যন্ত বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে নির্মিত একটি হাসপাতাল।
গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির এ অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্থাপত্যশিল্পের সক্ষমতাকে তুলে ধরার পাশাপাশি শ্রমিকবান্ধব ও পরিবেশসম্মত শিল্পকারখানা নির্মাণের গুরুত্বও সামনে এনেছে।
