১২ বছর আগে ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর বড়াইগ্রামে বাসে-বাসে সংঘর্ষে ৩৮ জন নিহত হয়েছিলেন; একই তারিখে ২০২৬ সালে বাস-ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ১২ জন, আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন।
নাটোরের বড়াইগ্রামে যেন ইতিহাসের এক নির্মম পুনরাবৃত্তি। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর উপজেলার বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৮ জন মানুষ। ঠিক ১২ বছর পর, ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর একই উপজেলায় নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বনপাড়া পৌরসভার সরকারপাড়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেল ১২ জনের। আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। একই তারিখে, একই উপজেলায় দুই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—সড়কে প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে সরকারপাড়া এলাকায় বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি স্পেশাল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে নয়জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিক, নাটোর জেনারেল হাসপাতাল ও গুরুতর আহতদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

নিহতরা হলেন—বাসচালক মো. সোহেল রানা (৪০), পিতা—আব্দুল হাকিম, গ্রাম ফরাদপুর, থানা—গোদাগাড়ী, জেলা—রাজশাহী; আনোয়ার হক (৩০), পিতা—বাবর আলী, গ্রাম—চায়পাড়া, থানা—বাগমারা, জেলা—রাজশাহী; তাসফিয়া (৮), পিতা—শহিদুল ইসলাম, গ্রাম—সুবিদ আলী, থানা—মির্জাগঞ্জ, পটুয়াখালী; জুয়েল (৪০), পিতা—জহর উদ্দিন, গ্রাম—রামকৃষ্ণপুর, থানা—জাজিরা, শরীয়তপুর; ট্রাকচালক মো. কালাম (৫০), পিতা—জাকির, গ্রাম—বরাতলা, থানা—ঝিনাইদহ; সালাল মোল্লা (৪৫), পিতা—জাহান উদ্দিন মোল্লা, গ্রাম—ডুবি সাহাবুর, থানা—জাজিরা, শরীয়তপুর; মো. শাহিন (৩৫), পিতা—রাজ্জাক, গ্রাম—কাজির হাট, থানা—জাজিরা, শরীয়তপুর; সোহাগ (৩০), পিতা—ইউনুস, গ্রাম—ডুবি সাহাবুর, থানা—জাজিরা, শরীয়তপুর; আব্দুস সামাদ (৭০), পিতা—আরব আলী ফকির, গ্রাম—ডুবি সাহাবুর, থানা—জাজিরা, শরীয়তপুর; মো. শহিদুল ইসলাম (৪৫), পিতা—আজাহার হাওলাদার, গ্রাম—পূর্ব সুবিদখালী, থানা—মির্জাগঞ্জ, পটুয়াখালী; মৃত রাসেল (৩৫), পিতা—মৃত সাজ্জাদ, গ্রাম—কলমুডাঙ্গা, থানা—সাপাহার, নওগাঁ; শ্রী হিমেল পরিজন (৩০), পিতা—শ্রী দ্বারা, গ্রাম—বাকুমদিয়া, থানা—ফরিদপুর, জেলা—ফরিদপুর।
এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৩০ জন। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াতকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি ও নিহতদের ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে নিহত পরিবারগুলোকে এক লাখ টাকা করে প্রদানের ঘোষণা ও রাস্তা প্রশস্তকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোরের স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু।
২০১৪ সালের সেই ভয়াবহ দিন
২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কের রেজুর মোড়ে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী কেয়া পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে গুরুদাসপুরগামী অথৈ পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি বাস ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা বাসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের পর যানবাহন দুটি সড়কের পাশে ছিটকে পড়ে। একটি বাস পানিতে এবং অন্যটি পাশের খাদে পড়ে যায়। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
এক যুগ পরও একই প্রশ্ন
১২ বছর আগে বাসের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ, আর এবার বাসের সঙ্গে বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষ। দুর্ঘটনা দুটির ধরন ও পরিস্থিতি এক নয়, তবে একই তারিখে একই উপজেলায় এমন প্রাণঘাতী ঘটনা মানুষের মনে পুরোনো ক্ষত আবারও জাগিয়ে তুলেছে।
বড়াইগ্রামের এই দুই ট্র্যাজেডি শুধু দুটি দুর্ঘটনার স্মৃতি নয়! এটি সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যর্থতা ও করণীয় নিয়ে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবরের শোকের স্মৃতি মুছে যাওয়ার আগেই ২০২৬ সালের একই তারিখে নতুন করে প্রাণহানির ঘটনা ঘটল।
