স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ অর্থনৈতিক সক্ষমতার স্বীকৃতি হলেও এর প্রভাবে বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি খাত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) প্রাক্কলনের বরাতে জানা গেছে, উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাণিজ্যিক সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার পর্যন্ত সংকুচিত হতে পারে। যদিও ২০১৮ সালের বাণিজ্য উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এই বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক প্রধান বাজারগুলোতে শুল্কের হার বাড়লে স্থানীয় তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তীব্র চাপের মুখে পড়বে। রাজধানীর একটি সেমিনারে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) যৌথ উদ্যোগে এলডিসি উত্তরণের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খানের উপস্থাপিত বিশ্লেষণে উঠে আসে, অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা উঠে গেলে দেশের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদারদের কাছে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়বে। এর প্রভাবে কানাডায় বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৪২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, জাপানে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে প্রায় ২৬ দশমিক ২৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে বেশ কিছু বড় অংশীদার উত্তরণ-পরবর্তী নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এ সুবিধা অব্যাহত রাখার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া অভ্যন্তরীণ আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বহাল রাখবে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান ও তুরস্ক অতিরিক্ত তিন বছর এবং চীন দুই বছরের জন্য এ সুবিধা ধরে রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই অন্তর্বর্তী সুবিধা বহাল থাকলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রপ্তানি হিসাব বিবেচনায় উত্তরণের পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত মোট রপ্তানির ৯০ দশমিক ৩ শতাংশ বা প্রায় ৪ হাজার ৩৫৯ কোটি ডলারের বাজার সুরক্ষিত থাকবে।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে বাণিজ্য ধরে রাখতে বাংলাদেশকে কানাডার জিপিটি প্লাস, ইইউর জিএসপি প্লাস কিংবা যুক্তরাজ্যের এনহ্যান্সড প্রেফারেন্স ব্যবস্থার মতো বিকল্প কাঠামোর শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব কাঠামোর আওতায় পণ্যের উৎসের নিয়মাবলি (রুলস অব অরিজিন) রপ্তানিকারকদের জন্য বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে কানাডায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত রয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে শুল্কশ্রেণি পরিবর্তন বা যথাক্রমে ৩০ ও ২৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন বাধ্যতামূলক হবে। একইভাবে সিরামিক, হোম টেক্সটাইল ও কৃষিপণ্যেও কঠোর শর্তের মুখোমুখি হতে হবে। অন্যদিকে দেশের রপ্তানি খাত এখনো বিপজ্জনকভাবে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীল। গেল অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে মাত্র ১০টি পোশাকপণ্য থেকে, যেখানে এককভাবে সুতি টি-শার্ট থেকেই এসেছে ৭০০ কোটি ৮০ লাখ ডলার। রপ্তানি পণ্যের এই বহুমুখীকরণের ঘাটতি উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাও এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জকে গভীর করছে বলে সেমিনারে সতর্ক করা হয়। দুর্বল কর-জিডিপি অনুপাত, বিদেশি ঋণের গড় সুদহার ২ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত হওয়া এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে ১২৭ কোটি ডলারে নেমে আসায় সরকারের বিনিয়োগ সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া উত্তরণের পর ডব্লিউটিওর বিধিমালার কারণে রপ্তানিতে সরাসরি নগদ ভর্তুকি প্রদান বন্ধ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে নগদ সহায়তার পরিবর্তে কারখানা আধুনিকায়ন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব উৎপাদনব্যবস্থা এবং শ্রমমান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় নীতিগত সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে বিএফটিআই। একই সাথে ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিপর্যয় না ঘটলেও মেধাস্বত্ব সুরক্ষার ছাড় উঠে যাওয়ার তিন থেকে চার বছর পর নতুন উদ্ভাবিত ও পেটেন্টপ্রাপ্ত ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া জাতিসংঘের বাজেটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় বাংলাদেশের আর্থিক চাঁদার হারও বহুগুণ বাড়বে।
পূর্বঘোষিত সময়সীমা অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের তারিখ নির্ধারিত ছিল। তবে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং অভ্যন্তরীণ নানা অস্থিতিশীলতার কারণে প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে সরকার। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি ইতিবাচক বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ পরিষদে সুপারিশ পাঠিয়েছে, যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চলতি মাসেই আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বাড়তি সময়কে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে সরকার ২০২৬ থেকে ২০২৯ মেয়াদি চার ধাপের একটি জাতীয় পথনকশা গ্রহণ করেছে। এই রূপরেখার আওতায় প্রথম ধাপে সামষ্টিক অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দ্বিতীয় ধাপে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন, তৃতীয় ধাপে শিল্পে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন এবং চূড়ান্ত ধাপে সার্বিক সক্ষমতা মূল্যায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ধরে রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
