প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল এনেছে বিএনপি সরকার। রবিবার এক দিনে ১০টি প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সচিব পর্যায়ে সাতজনের দপ্তর পরিবর্তন, একজন অতিরিক্ত সচিবকে পদোন্নতি দিয়ে সচিব নিয়োগ এবং দুজন অতিরিক্ত সচিবকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে একজন সচিবকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের এই পুনর্বিন্যাসকে শুধু নিয়মিত
বদলি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এর মধ্য দিয়ে কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি এবং সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে আন্তরিকতার বিষয়ে কঠোর বার্তা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনে গতি ফেরানোর কথা বলে আসছে। কিন্তু সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসেনি— এমন অসন্তোষ রয়েছে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, কাজের প্রতি অনীহা এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা আদায়ে বেশি মনোযোগী হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। আলোচনায় আছে বিদেশ সফর ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়ে কর্মকর্তাদের আগ্রহের বিষয়টিও।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে একযোগে রদবদলকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের প্রত্যাশা, কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দেবেন এবং সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শতভাগ আন্তরিকতা দেখাবেন। দায়িত্ব পালনে প্রত্যাশিত দক্ষতা ও সহযোগিতা না থাকলে পদে বহাল থাকার নিশ্চয়তা নেই— এমন বার্তাও রয়েছে এই পদক্ষেপে।
দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থাকলে ছাড় নয় : বিএনপি সরকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব পরিবর্তনে অনীহা দেখায়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে পরিবর্তন এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের ঘোষণা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনাও প্রায় একই বার্তা। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়কমন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। এদিন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। পরে তা গৃহীত হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব ও পদে পরিবর্তনের নজির রয়েছে। প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একইভাবে কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রশাসনের শীর্ষ পদে পরিবর্তনের তাৎপর্য হলো কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একটি পদে দায়িত্ব পালন করলেই সেখানে তার অবস্থান স্থায়ী হয়ে যায় না। সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ করতে না পারলে কিংবা দায়িত্ব পালনে প্রত্যাশিত দক্ষতা দেখাতে ব্যর্থ হলে তাকে সরিয়ে অন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
তবে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আকরাম হোসেন বলেন, এসব রদবদলকে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নতুন নেতৃত্ব আনা, দায়িত্বের ভারসাম্য তৈরি এবং কাজের গতি বাড়ানোর লক্ষ্যও থাকতে পারে। কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হলে শুধু বদলি বা সংযুক্তির ভিত্তিতে তার কর্মদক্ষতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক হবে না।
যারা পেলেন নতুন দায়িত্ব : ১৮ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারকে সচিব পদে পদোন্নতি দিয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আতাউর রহমান খানকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়াকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান পদে বদলি করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফুল ইসলামকে জাতীয় প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব মর্যাদা) করা হয়েছে। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. আবুল হাছানাত হুমায়ূন কবীরকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমির রেক্টর ড. কামরুজ্জামানকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব করা হয়েছে। এ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমিকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব মর্যাদা) পদে বদলি করা হয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল আলম খানকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থার নেতৃত্বে নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্য, নৌপরিবহন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দায়িত্ব পরিবর্তনের ফলে নতুন কর্মকর্তাদের কাজের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে নতুন প্রবণতা : প্রশাসনের শীর্ষ পদে রদবদলের পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগের সরকারের সময় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চুক্তিতে সচিবসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বদলে নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে দায়িত্ব দেওয়া এবং কোথাও কোথাও ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়োগের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
১৮ অক্টোবরের প্রজ্ঞাপনেও দুজন অতিরিক্ত সচিবকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে ভূমি মন্ত্রণালয়েও এমদাদুল হক চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এসব সিদ্ধান্ত থেকে আপাতত ধারণা করা যায়, গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার নিয়মিত কর্মকর্তাদের কাজে লাগানোর বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব এএসএম সালেহ আহমেদের চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোর বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য। তার চুক্তির মেয়াদ না বাড়ানোয় প্রশাসনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে একটি নিয়োগের মেয়াদ না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
গত আগস্টে সচিব ও সমমর্যাদার ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে ২৩ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অর্থাৎ ওই সময় কর্মরত সচিবদের প্রায় ২৯ শতাংশ ছিলেন চুক্তিভিত্তিক। এ পরিসংখ্যান প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে সম্প্রতি পরিবর্তন এসেছে ওই ধারায়।
মূল্যায়নের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ : ভারপ্রাপ্ত সচিব নিয়োগের একটি সম্ভাব্য তাৎপর্য হলো, দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের সক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ তৈরি হওয়া। কর্মদক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে বার্তা রদবদলের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে, তার সঙ্গে এ ধরনের নিয়োগের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রশাসনে কর্মদক্ষতা বাড়াতে শুধু বদলি বা পদায়ন যথেষ্ট নয়। কর্মকর্তাদের কাজের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, নির্ধারিত সময়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং জনসেবার মান যাচাইয়ের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। একই সঙ্গে পদোন্নতি ও পদায়নে পেশাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং নিরপেক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। এক দিনে ১০টি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় নতুন বার্তা দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই রদবদলের ফলে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর কাজে কতটা গতি আসে এবং সরকারের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের ভূমিকা কতটা দৃশ্যমান হয়। শুধু পদ পরিবর্তন নয়, কাজের ফলাফল দিয়ে কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা গেলে সরকারের জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতার নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটবে।
