সর্বোচ্চ গোলদাতা সাদিয়ার স্বপ্ন নারী ফুটবলকে এগিয়ে নেয়া
আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল
মাহফুজুল ইসলামপ্রকাশ:
শৈশবের ফুটবলপ্রেম থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখা, এবার আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় নারী ফুটবল প্রতিযোগিতায় গোলের বন্যা বইয়ে দিলেন সাদিয়া আক্তার। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) জার্সিতে একের পর এক গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার স্বীকৃতি পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এই শিক্ষার্থী।
নারীদের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়কে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছে যবিপ্রবি, যেখানে একাই সাত গোল করেছেন সাদিয়া। গ্রুপপর্ব ও সেমিফাইনাল মিলিয়ে তার মোট গোলসংখ্যা ১২টি।
সাদিয়ার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে শৈশবের ভালোবাসা, পরিবারের সমর্থন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিজ্ঞতা এবং দেশের নারী ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন।
সাদিয়ার ফুটবলের সঙ্গে পথচলা শুরু প্রায় ১১ বছর বয়সে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। মেয়ের এই ভালোবাসাকে দমিয়ে না রেখে বরং উৎসাহ জুগিয়েছেন তার মা-বাবা। মাঠে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে খেলতে অনুপ্রাণিত করা-প্রতিটি ধাপে পাশে থেকেছেন তারা।
সাদিয়ার ভাষায়, তার ফুটবল ক্যারিয়ারে মা-বাবার অবদান অনেক বেশি। শৈশবের সেই আগ্রহকে সঙ্গে নিয়েই ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন প্রতিভাবান ফুটবলার হিসেবে। মাঠের অনুশীলন, প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের অভিজ্ঞতা আর ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছে তার আজকের অবস্থান।
সাদিয়ার ফুটবল ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশের জাতীয় দলের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৪ পর্যায়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, তাজিকিস্তান ও ভারতে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এছাড়া দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত স্পেশাল অলিম্পিক গেমসেও ফুটবল খেলেছেন তিনি।
দেশের ঘরোয়া ফুটবলেও রয়েছে তার অভিজ্ঞতা। খেলেছেন উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগে। উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগের একটি ম্যাচে ছয়টি গোল করেন সাদিয়া। বাংলাদেশের নারী ফুটবলে এক ম্যাচে ছয় গোল করার সেই অর্জনকে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় সাফল্য হিসেবে দেখেন তিনি।
এছাড়া বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) শিক্ষার্থী থাকাকালে ভারতের আন্তর্জাতিক সুব্রত কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টেও তিনবার অংশ নিয়েছেন সাদিয়া। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ও দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের লিগে খেলার অভিজ্ঞতা তার বর্তমান পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যবিপ্রবির জার্সি গায়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নিয়ে সাদিয়া বলেন, ‘যবিপ্রবির হয়ে ভালো পারফরম্যান্স করতে পেরে আমি সত্যিই অনেক আনন্দিত ও গর্বিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে মাঠে নামা আমার জন্য অনেক সম্মানের। এই অর্জনের পেছনে আমার সতীর্থ, কোচ, শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনেক অবদান রয়েছে। সবার সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আমাকে ভালো খেলতে সাহায্য করেছে। ভবিষ্যতেও যবিপ্রবির সুনাম ধরে রাখতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আরও ভালো কিছু অর্জন করতে চাই।’
সাদিয়ার ফুটবল পথচলায় কোচ জয়া চাকমা, ইমরুল হাসান ইমু, আবদুর রাজ্জাকসহ আরও অনেক কোচ ও শিক্ষকের কাছ থেকে পেয়েছেন প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। ফুটবলের কৌশল শেখার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা পেয়েছেন সাদিয়া। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের পরামর্শ ও অনুপ্রেরণা তাকে প্রতিনিয়ত নিজের খেলার মান উন্নত করতে সাহায্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রের নারী ফুটবল দলের তারকা খেলোয়াড় অ্যালেক্স মর্গানকে অনুসরণ করেন সাদিয়ে। মর্গানের খেলার দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও গোল করার ক্ষমতা সাদিয়াকে অনুপ্রাণিত করে। তার খেলা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের পারফরম্যান্স আরও উন্নত করার চেষ্টা করেন এই ফুটবলার।
সাদিয়ার স্বপ্ন কেবল একজন সফল ফুটবলার হয়ে ওঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভবিষ্যতে একজন দক্ষ ফুটবল কোচ হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তিনি। ইতিমধ্যে এএফসি বি ডিপ্লোমা কোচিং কোর্স সম্পন্ন করেছেন সাদিয়া। কোচিংয়ের এই যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে দেশের নারী ফুটবলের উন্নয়নে অবদান রাখতে চান তিনি। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মেয়েদের ফুটবলে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করা এবং তাদের জন্য সম্ভাবনার পথ তৈরি করাকে নিজের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে দেখেন।
তার এই পরিকল্পনায় রয়েছে খেলোয়াড়ি অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহযোগিতা করার প্রত্যয়। মাঠে গোল করা যেমন তার বর্তমান পরিচয়ের অংশ, তেমনি ভবিষ্যতে অন্যদের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্নও তাঁর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
