বেকারত্ব ঘোচাতে আর চাকরির পেছনে ছোটাছুটি নয়; আধুনিক কৃষিতেই লুকিয়ে আছে লাখপতি হওয়ার হাতছানি। পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার প্রত্যন্ত কাটাখালী গ্রামে ‘মালচিং’ পেপার ও মাচা পদ্ধতিতে অসময়ে তরমুজ উৎপাদন করে তাক লাগানো সাফল্য পেয়েছেন মো. সোহাগ হোসেন মৃধা।
সামান্য খরচে দ্বিগুণ লাভের এই অভিনব উদ্যোগ এখন স্থানীয় বেকার তরুণদের কৃষির দিকে নতুন করে আকৃষ্ট করছে।
পরিবেশবান্ধব ‘মালচিং’ পদ্ধতিতে ১০ একর জমিতে ১৮ হাজার চারা রোপণ করে অসময়ে তরমুজ উৎপাদনে অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহাগ হোসেন মৃধা।
উপজেলার দশমিনা সদর ইউনিয়নের কাটাখালী গ্রামে আধুনিক এই পদ্ধতিতে তরমুজ আবাদ করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে ৮ লাখ টাকা খরচ করে অন্তত ১৫ লাখ টাকা বিক্রির জোরালো সম্ভাবনা দেখছেন এই কৃষক। ইতোমধ্যে কয়েক লাখ টাকার তরমুজ বিক্রিও সম্পন্ন করেছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট কৃষি সূত্র জানায়, প্রচলিত সাধারণ পদ্ধতিতে তরমুজের ফলন বছরে কেবল একবারই হয়ে থাকে। কিন্তু মো. সোহাগ হোসেন মৃধা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি প্রয়োগে বছরে একাধিকবার তরমুজ উৎপাদন করে অধিক লাভবান হওয়া সম্ভব। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় উন্নত জাতের বীজ দিয়েই বছরে তিনবার তরমুজের আবাদ করা যায়, যার ফলে বাজারে বারো মাসই তরমুজ সরবরাহ রাখা সম্ভব।
সোহাগ মূলত ‘রিজেন্ট-২’ জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। তার এমন সাফল্য দেখে এলাকার অন্যান্য কৃষকেরাও এখন এই চাষে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
পদ্ধতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রচলিত চাষে তরমুজের বীজ সরাসরি জমিতে রোপণ করা হয়। কিন্তু মালচিং পদ্ধতিতে বিশেষ পলিথিন পেপারে মুড়িয়ে অঙ্কুরিত চারা জমিতে রোপণ করা হয়। এ পদ্ধতিতে প্রথমে মালচিং পলিথিনের বেড তৈরি করে বীজ স্থাপন করা হয়। পরে মালচিং পেপার ছিদ্র করে চারা অঙ্কুরিত হওয়ার পর তা বাঁশের তৈরি মাচায় তুলে দেওয়া হয়।
গাছের গোড়া ও মাটি পলিথিন দিয়ে আবৃত থাকার কারণে কোনো ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ সহজে আক্রমণ করতে পারে না। ফলে খেতে বাড়তি কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে না। একই সঙ্গে মাটির আর্দ্রতা ধরে রেখে ক্ষতিকর সূর্যালোক থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়।
এছাড়া সাধারণ পদ্ধতিতে ভারি বৃষ্টি হলে খেত থেকে সার ধুয়ে-মুছে যাওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, মালচিং পেপার থাকায় সেই আশঙ্কা একেবারেই থাকে না।
প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে এ পদ্ধতিতে গাছ দেড়গুণ দ্রুত বেড়ে ওঠে। এসব বহুমুখী সুবিধার কারণে সোহাগের সফলতা দেখে এলাকার অনেক কৃষক এখন অসময়ে তরমুজ চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহাগ হোসেন মৃধা জানান, তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ৭ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন এবং খেত থেকে আরও অন্তত ৮ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রির আশা করছেন।
তিনি বলেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে তাকে নিয়মিত পরামর্শ ও খোঁজখবর দিয়ে সার্বিক সহায়তা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, বেকার যুবকেরা কৃষিতে উদ্যোক্তা হয়ে এগিয়ে আসতে পারেন; কারণ অসময়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তরমুজ চাষ করে দ্রুত স্বাবলম্বী হওয়ার দারুণ সুযোগ রয়েছে।
দশমিনা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাফর আহমেদ জানান, কৃষক মো. সোহাগ হোসেন মৃধাকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তাসহ সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অসময়ে আধুনিক পদ্ধতিতে তরমুজ চাষে ঝুঁকি কম এবং লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। নতুন করে কেউ এ ধরনের আধুনিক কৃষি উদ্যোগে সম্পৃক্ত হতে চাইলে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে সব ধরনের কারিগরি ও মাঠপর্যায়ের সহায়তা দেওয়া হবে।