দেশের শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর দাবি, পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ সরবরাহ করছে, আর দেশের ভেতরে একটি পক্ষ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠে (হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠ) আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কয়েকটি স্থানে কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। এ বিষয়ে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি এসব ঘটনায় অর্থ জোগাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, দেশের ভেতরে বিভ্রান্তি ছড়ানো একটি রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে তারা এক হয়ে কাজ করছে। এক পক্ষ সীমান্তের ওপার থেকে অর্থ দিচ্ছে, অন্য পক্ষ দেশের ভেতরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা যেন কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে বন্ধ কলকারখানা চালু এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানির সুযোগ বাড়ানোর চেষ্টাও চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, এসব উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করতে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল অন্য কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এতে সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজের গতি কমে যেতে পারে। তিনি বলেন, যেসব কর্মসূচির কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেসব কর্মসূচি গ্রহণকারীরা জনগণের বন্ধু হতে পারে না।
একাত্তর ও চব্বিশের প্রসঙ্গ টানলেন প্রধানমন্ত্রী
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় স্বৈরাচারী সরকার পালিয়ে যাওয়ার আগে শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছিল বলে তিনি মনে করেন। বিএনপি একুশ, একাত্তর ও চব্বিশের চেতনাকে ধারণ করে শহীদ পরিবার এবং জুলাইয়ের আহত যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়িয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী জানান, জুলাই শহীদদের স্মরণে সোমবার ঢাকার ওসমানী উদ্যানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্মৃতিস্তম্ভের অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের আন্দোলনের চেতনার কথা বলা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাদের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
এ ঘটনাকে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কাজের মধ্যে অসংগতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মতো ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রেও কিছু দল জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে। তাদের বক্তব্যের সঙ্গে কর্মকাণ্ডের মিল নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে ঐক্যের আহ্বান
দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলে দেশি-বিদেশি মহল বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাঁর দাবি, একই ধরনের শক্তি আবারও সক্রিয় হয়ে উন্নয়নের গতি থামানোর চেষ্টা করছে।
দেশের অগ্রগতি ধরে রাখতে জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
বন্ধ কারখানা চালু ও কৃষিঋণ মওকুফের তথ্য তুলে ধরলেন
সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সরকার গঠনের সাত মাসের মধ্যে উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে দেশের ছয়টি বন্ধ মিল-কারখানা চালু করা হয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ৪৬টি বন্ধ কলকারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের প্রায় ৩৮ থেকে ৩৯ হাজার আখচাষির জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গঠনের সাত দিনের মধ্যে ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এ বছর ৪০ লাখ কৃষকের কাছে কৃষি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
সেচ ও পানির সংকট নিরসনে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত আট মাসে ৮০০ কিলোমিটার খনন সম্পন্ন হয়েছে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে পদ্মা ও তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ৫০ থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করা, পরিবেশ রক্ষায় ২৫ কোটি গাছ লাগানো, মেয়েদের অনার্স পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা ও উপবৃত্তি দেওয়া এবং নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড চালুর উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।
এই বাংলা/এমএস
