মাগুরার মহম্মদপুরে রাজু আহমেদ নামের এক যুবক তার সেলুনে গড়ে তুলেছেন ভিন্নধর্মী পাঠাগার। যেখানে চুল কাটার সরঞ্জাম– কাঁচি-চিরুনির পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে শতাধিক বই। চুল কাটতে এসে অপেক্ষমান ব্যক্তিরা সময় কাটাচ্ছেন বই পড়ে।
উপজেলার বালিদিয়া ইউনিয়নের শিকদারের মোড়ে এই সেলুন। বাইরে থেকে সাধারণ দোকান মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে ভিন্ন দৃশ্য। দেয়ালজুড়ে কবিতার পঙ্ক্তি, অনুপ্রেরণামূলক লেখা আর সাজানো বইয়ের সংগ্রহ। গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও ইসলামি বইসহ নানা ধরনের বই রয়েছে এখানে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অল্প বয়সেই বাবা-মাকে হারান রাজু আহমেদ। অভাব-অনটনের কারণে নবম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। জীবিকার তাগিদে বেছে নেন চুল কাটার পেশা। প্রায় ১০ বছর ধরে এ পেশায় যুক্ত তিনি। প্রথমে স্থানীয় কলমধারী বাজারে কাজ শেখেন। পরে ঢাকার বিভিন্ন সেলুনে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এরপর বাড়িতে ফিরে গড়ে তোলেন নিজের সেলুন।
রাজু জানান, একদিন চুল কাটার সময় এক ব্যক্তির কটূক্তি বদলে দেয় তার চিন্তাভাবনা। ওই ব্যক্তি তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি নাপিত, তুমি অশিক্ষিত, তুমি আমার সঙ্গে কী কথা বলবা?’ কথাটি গভীরভাবে আঘাত করে রাজুকে। সেই অপমানের প্রতিবাদ জানাতেই নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখেন ‘অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন’।
তবে রাজু বিশ্বাস করেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেলেও জ্ঞান অর্জনের পথ বন্ধ হয়ে যায় না। তাই নিজের দোকানে মাত্র তিনটি বই দিয়ে শুরু করেন পাঠাগার। ধীরে ধীরে গ্রাহকদের সহযোগিতায় বইয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে শতাধিক। রাজুর এমন উদ্যোগে খুশি স্থানীয় বাসিন্দারাও।
শুধু বই পড়ার সুযোগই নয়, মানবিক উদ্যোগেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাজু। নিজে এতিম হওয়ায় এতিম শিশুদের বিনা মূল্যে চুল কাটার ব্যবস্থা রেখেছেন। মসজিদের ইমাম ও খতিবদের জন্য রয়েছে অর্ধেক মূল্যে সেবা। পাশাপাশি বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্যও বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। এছাড়া ‘রাস্তার পাগলদেরও’ বিনামূল্যে চুল দাড়ি পরিষ্কার করে দেন তিনি।
রাজু আহমেদ বলেন, ‘একজন শিক্ষিত মানুষ অনেকের সামনে আমাকে অশিক্ষিত বলে অপমান করেছিলেন। কথাটি খুব কষ্ট দিয়েছিল। সেই কষ্ট থেকেই দোকানের নাম রেখেছি অশিক্ষিত রাজু সেলুন জোন। আমি চাই, আমার দোকানে এসে মানুষ শুধু চুল কাটবে না, বই পড়ে জ্ঞানও অর্জন করবে। একদিন এখানে বড় একটি পাঠাগার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি।’
সেলুনের নিয়মিত গ্রাহক আল আমিন বলেন, ‘আগে চুল কাটার সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করতে হলে মোবাইল দেখতাম কিংবা বাজারে ঘোরাঘুরি করতাম। এখন রাজু ভাইয়ের দোকানে বসে বই পড়তে পারি। এটা খুব ভালো উদ্যোগ।’
বালিদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান মিনা বলেন, ‘রাজু নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। কিন্তু অন্যদের বই পড়তে উৎসাহিত করছে। তার এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। সবাই সহযোগিতা করলে এটি আরও বড় পাঠাগারে পরিণত হতে পারে।’
অপমান আর বঞ্চনাকে পেছনে ফেলে নিজের কর্মস্থলকেই জ্ঞানচর্চার জায়গায় পরিণত করেছেন রাজু আহমেদ। তার স্বপ্ন, একদিন ছোট্ট এই সেলুনের পাঠাগার বড় হবে, বইয়ের আলো ছড়িয়ে পড়বে এলাকার মানুষের মধ্যে।
