যানজট নিরসনের লক্ষ্যে নেওয়া বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়ন, বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ এবং অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে প্রকল্পটি চালুর সম্ভাবনা যাচাই করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বিকল্প হিসেবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও মেট্রোরেল গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের আহ্বান জানিয়েছেন জেলার সংসদ সদস্য ও বিশিষ্টজনেরা।
তাদের মতে, বিআরটি প্রকল্প ঘিরে দীর্ঘ ১৪ বছরের দুর্ভোগের পর গাজীপুরের মানুষের জন্য দ্রুত, সাশ্রয়ী ও কার্যকর গণপরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা না গেলে বিকল্প যাতায়াতব্যবস্থার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরাম আয়োজিত ‘দৃশ্যমান সমস্যা, অবারিত সম্ভাবনার গাজীপুর’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি উঠে আসে।
গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন বলেন, বিআরটি প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটি থাকলেও গাজীপুরের মতো জনবহুল এলাকায় প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানকার মানুষ গাজীপুরে বসবাস করেন না। জনবহুল এই জেলার উন্নয়নে জনসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান বলেন, যানজট নিরসনের জন্য বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। উত্তরা থেকে উড়ালসড়কের মাধ্যমে কালীগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও জয়দেবপুরমুখী সংযোগ তৈরি করা হলে যানচলাচলে সুবিধা হতে পারত। সড়কের মাঝখানে একাধিক বিভাজক দেওয়ায় যানচলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী বলেন, বিআরটি প্রকল্পের পরিবর্তে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তিনি বাসভাড়া কমানো এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গাজীপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের দাবি জানান।
গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, গাজীপুরের বর্তমান অবস্থা খুবই বিপন্ন। পরিবেশ রক্ষা করে এখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এই জেলায় বসবাস করেন। তাই আগামী ১০০ বছরের কথা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। অন্যথায় একসময় গাজীপুর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা নিশিতা বলেন, প্রত্যেক সরকারকেই ভালো কাজ করার জন্য কিছু সময় দিতে হয়। একইভাবে বিএনপি সরকারকেও সময় দিতে হবে। তাহলেই দেশ ও জাতির উন্নয়ন হবে।
শিল্পদূষণ, জলাবদ্ধতা ও আইনশৃঙ্খলা নিয়েও উদ্বেগ
বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে শিল্পবর্জ্য ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কলকারখানার কারণে গাজীপুরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পরিবেশ রক্ষায় শিল্পকারখানার কার্যক্রমে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন এলাকার যানজট, জলাবদ্ধতা, মাদক, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, সড়কে বর্জ্য ফেলা, রেলস্টেশনের অকার্যকারিতা, বনভূমি দখল ও কৃষিজমি ভরাটের সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়। এসব সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন বক্তারা।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বলেন, গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ আগের চেয়ে আরও বেশি তৎপর।
গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী মাদক নির্মূলে পুলিশের সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করেন। তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি পার্ক নির্মাণের প্রস্তাবও দেন।
ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ফয়সাল আলমের সভাপতিত্বে বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হক। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল খান। এ সময় ফোরামের সিনিয়র সহসভাপতি আতাউর রহমান, দপ্তর সম্পাদক এস এম নূর মোহাম্মদ, যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক সাব্বির আহমেদ এবং জ্যেষ্ঠ সদস্যরা বক্তব্য দেন।
বৈঠকে গাজীপুরের উন্নয়ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, যানজট নিরসন এবং জনদুর্ভোগ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
এমএইচএন/বিআরইউ
