সিচুয়েশনশিপ, ব্রেডকাম্বিং ও ঘোস্টিংয়ের পর তরুণ প্রজন্মের ডেটিং দুনিয়ায় আলোচনায় এসেছে নতুন শব্দ ‘ফ্রিফল ডেটিং’ বা ‘ভোল্টেজ ডেটিং’। জেন-জি ও মিলেনিয়ালদের মধ্যে আলোচিত এ প্রবণতায় সুস্থ ও স্থিতিশীল সম্পর্কের চেয়ে ক্ষণিকের রোমাঞ্চ, অনিশ্চয়তা এবং তীব্র আবেগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সম্ভাব্য ঝুঁকি জেনেও কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতাকেই বলা হচ্ছে ফ্রিফল ডেটিং।
মনোবিদদের মতে, এ ধরনের সম্পর্কে আকর্ষণের পেছনে কাজ করতে পারে গোপনীয়তা, অনিশ্চয়তা, উত্তেজনা কিংবা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। এসব অনুভূতি থেকে তৈরি হওয়া তীব্র আবেগকে অনেকে সত্যিকারের ভালোবাসা বা ‘কেমিস্ট্রি’ বলে ভুল করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ প্রবণতার বিভিন্ন দিক।
কেন ঝুঁকিপূর্ণ সম্পর্কে আকৃষ্ট হন তরুণরা?
ফ্রিফল ডেটিংয়ের উদাহরণ হতে পারে কর্মক্ষেত্রের কোনো সহকর্মীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া, যেখানে সম্পর্ক ভেঙে গেলে পেশাগত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে গোপন সম্পর্ক কিংবা এমন কারও প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হওয়াও এর উদাহরণ হতে পারে, যিনি আবেগগতভাবে সম্পর্কে উপস্থিত নন।
এ ধরনের সম্পর্কে অনিশ্চয়তা ও গোপনীয়তা আকর্ষণকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। কখনো কাছে টানা, আবার কখনো দূরে সরিয়ে দেওয়ার মতো আচরণও সম্পর্কে উদ্বেগ ও অস্থিরতা তৈরি করে। আর সেই অস্থিরতার মধ্যেই পাওয়া সাময়িক মনোযোগকে অনেকে গভীর ভালোবাসার প্রমাণ বলে মনে করেন।
তীব্র আকর্ষণ মানেই কি ভালোবাসা?
মনোবিদদের মতে, আবেগের তীব্রতা কোনো সম্পর্কের স্থায়িত্ব কিংবা দুজন মানুষের মধ্যে সামঞ্জস্যের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়। সম্পর্কে সব সময় উত্তেজনা, নাটকীয়তা কিংবা আবেগের চরম ওঠানামা থাকলেই সেটি সফল হবে, এমন ধারণার ভিত্তি নেই।
বরং প্রকৃত ভালোবাসা অনেক সময় শান্ত ও স্থিতিশীল হয়। যেখানে দুজন মানুষ নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন, একে অপরের ওপর আস্থা রাখতে পারেন এবং মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে যাদের ভালোবাসা কিংবা মানসিক নিরাপত্তা পেতে বারবার সংগ্রাম করতে হয়েছে, তারা অবচেতনভাবেই এমন সঙ্গীর প্রতি আকৃষ্ট হতে পারেন, যার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল নয়। কারণ দীর্ঘদিনের পরিচিত অস্থিরতাকেই তখন তারা স্বাভাবিক সম্পর্কের অংশ বলে মনে করতে পারেন।
সম্পর্কের সিদ্ধান্তে এআই, জ্যোতিষ ও ট্যারোটের ওপর নির্ভরতা
ফ্রিফল ডেটিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় আসছে সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নিতে বাইরের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টিও। সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক টিকবে কি না, সম্ভাব্য সঙ্গী সত্যিই ভালোবাসেন কি না কিংবা ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে—এসব জানতে অনেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), জ্যোতিষ কিংবা ট্যারোট কার্ড রিডারের সাহায্য নিচ্ছেন।
মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, এসব উৎস সাময়িক মানসিক স্বস্তি দিতে পারে। তবে এগুলো নিজের অভিজ্ঞতা, বিচারবোধ ও আত্মসচেতনতার বিকল্প নয়। সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বাইরের কোনো উৎসের নিশ্চয়তা খোঁজার চেয়ে নিজের অনুভূতি ও বাস্তব অভিজ্ঞতার দিকে মনোযোগ দেওয়া বেশি জরুরি।
সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি কোথায়?
সম্পর্কে তীব্র আকর্ষণ থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই আকর্ষণ যদি নিয়মিত উদ্বেগ, মানসিক চাপ কিংবা নিরাপত্তাহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান, আস্থা, মানসিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা। সঙ্গীর আচরণে ধারাবাহিকতা রয়েছে কি না, নিজের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ আছে কি না এবং সম্পর্কে স্বস্তি অনুভব করা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় সম্পর্কের স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষণিকের রোমাঞ্চ সম্পর্কের আকর্ষণ বাড়াতে পারে, কিন্তু শুধু তীব্র আবেগের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা কঠিন। তাই ভালোবাসার তীব্রতার পাশাপাশি সম্পর্কটি মানসিকভাবে কতটা নিরাপদ ও সুস্থ, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
