Published on
:
2 min read
বিদেশের মাটিতে শারদোৎসব মানেই প্রবাসীদের একত্রিত হয়ে এক টুকরো বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখার আনন্দ। ওঁদের দেবী কখনও বিদায় নেন না। বিসর্জনও হয় না। প্রত্যেক বছর নতুন মূর্তিও গড়া হয় না। তা সত্ত্বেও কলকাতার পুজোর স্বাদ পেতে চান ওঁরা। তাই চেমসফোর্ডে বসেই দুর্গাপুজো করেন ওরাঁ। ইংল্যান্ডের এসেক্সের একটি শহর চেমসফোর্ড। সেখানে কেউ চাকরি করেন। কেউ চিকিৎসক, কেউ কলেজের শিক্ষক। সবাই মিলে ঠিক করেন কোনও মতেই পুজো বাদ দেওয়া যাবে না। তাই পুজোর পরিকল্পনা করেন ওঁরা। নাম দেওয়া হয় ‘সংকল্প।’ দেখতে দেখতে সংকল্পের পুজো বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। এখন সেই সংকল্পের পুজোই মন কাড়ে সেখানকার বাঙালি-অবাঙালি সবার। এমনকী উদ্যোক্তাদের বিদেশি বন্ধুরাও চলে আসেন দুর্গাপুজো দেখতে। পাত পেড়ে প্রসাদও গ্রহণ করেন তাঁরা।
পুজোর উদ্যোক্তারা জানান, প্রথমে যে মূর্তি গড়েছিলেন সেই মূর্তিই প্রত্যেক বছর যত্ন করে রেখে দেওয়া হয়। তাতেই প্রতি বছর পূজিত হন দেবী। দুর্গাপুজোর তিথি অনুযায়ী তাঁদের পুজো করা সম্ভব হয় না। সবার ছুটি দেখে, বলা যায় উইক এন্ডে আয়োজন করা হয় দুর্গাপুজোর। ফাইবার গ্লাসের দুর্গাপ্রতিমায় মনের মতো করে মাকে সাজানো হয়। পুজোর সঙ্গে চলে দেদার খাওয়া-দাওয়া। বাঙালি খাবার তো আছেই। অবাঙালিরাও তাঁদের সঙ্গে রান্নার কাজে হাত লাগান। পুজো উদ্যোক্তাদের মধ্যে যে সবাই বাঙালি তা নয়। আছেন শিখ, গুজরাটি, পাঞ্জাবিরাও। এই উৎসবে মেতে ওঠেন সবাই। বাড়ির মেয়ে-বউরাও এই পুজো নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। পুজোর দিনে কারও বাড়িতেই হাঁড়ি চড়ে না। সবারই খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে মণ্ডপে। স্বেচ্ছাসেবকরা যেমন মায়ের ভোগ রান্না করেন। তেমন ঢাকও বাজান। আবার পুজোর মন্ত্রও পাঠ করেন। দিনের বেলায় খিচুড়ি, ভাজা ও পায়েস দেবীকে থালায় সাজিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। আবার রাতে পোলাও, লুচি ও আলুর দম রান্না করা হয়। উৎসবের শেষ পর্বে গোটা সম্প্রদায় একসঙ্গে লুচি বেলে, আর স্থানীয় শিখ সম্প্রদায় সকলের জন্য লঙ্গরের আয়োজন করে। পাশাপাশি, স্থানীয় খাবারের স্টল এবং বাঙালি মিষ্টির কাউন্টার এসেক্সের বুকে কলকাতার স্বাদ এনে দেয়।
তবে এ বছর প্লাস্টিকের পরিবর্তে বাঁশের তৈরি থালা ব্যবহার করা হচ্ছে। লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (UCL)-এর চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষক এবং সংকল্পের ট্রাস্টি শুভব্রত মিত্র বলেন, ‘এ বছর মানুষের শারীরিক সুস্থতার প্রতিও বিশেষ নজর দিচ্ছে সংকল্প। আয়োজিত হবে স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক আলোচনা। সুস্থতা সংক্রান্ত পরামর্শ এবং যোগ্য দর্শনার্থীদের জন্য NHS-এর পক্ষ থেকে বিনামূল্যে ফ্লু ও কোভিড-১৯-এর টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এ বারের অন্যতম আকর্ষণ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে একটি আলোচনা সভা, যার নেতৃত্ব দেবেন চিকিৎসা পরামর্শদাতা অরিন্দম দাস।’ সংকল্পের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেবলীনা গুপ্ত বলেন, ‘NHS-এ কাজ করার সুবাদে আমি প্রত্যক্ষ ভাবে বুঝতে পারি, মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ, অন্তর্ভুক্তি এবং সম্প্রদায়বোধ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার অর্থ শুধু তাকে উদযাপন করা নয়, আমাদের সম্প্রদায় এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করাও তারই অংশ।’
সব শেষে বিসর্জনের পালা। সিঁদুর খেলার পালা। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে দেবীকে বরণ করে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন মহিলারা। ঘট এবং কিছু ফুল স্থানীয় নদীতে বিসর্জন দেওয়া হলেও বাকি ফুল ও ফলের খোসা স্বেচ্ছাসেবকদের বাগানে কম্পোস্ট বা জৈবসারে পরিণত করা হয়। দেবীর সাজসজ্জার সামগ্রী যত্ন করে তুলে রাখা হয়, যাতে পরের বছরও ব্যবহার করা যায়।
পুজোর আরও এক উদ্যোক্তা ববি বিশ্বাস জানান, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সংকল্পকে আরও বড় করার ইচ্ছা সবার। ‘গ্রিন সংকল্প পুজো’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাঁদের লক্ষ্য, এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করা, যারা বুঝবে—ভক্তি এবং প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা আসলে একই সূত্রে বাধা।