প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প চালু নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই প্রকল্প দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছে গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ। একই সঙ্গে নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলা কিংবা প্রকল্প পরিত্যক্ত করার উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। সংগঠনের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খসরু মিয়া।
লিখিত বক্তব্যে ড. মো. খসরু মিয়া বলেন, গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকা। রাজধানীর কাছাকাছি অবস্থান হলেও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, দীর্ঘ যাত্রার সময়, তীব্র যানজট এবং অকার্যকর গণপরিবহনের কারণে এ অঞ্চলের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে যাতায়াত করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকছেন। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমছে, পরিবহন ব্যয় বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধান এবং দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই গাজীপুর-এয়ারপোর্ট বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১৪ বছর অপেক্ষার পরও গাজীপুরবাসী কাঙ্ক্ষিত আধুনিক গণপরিবহনসেবা পাননি। এ অবস্থায় দ্রুত, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহনব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি।
বিআরটি চালু হলে গাজীপুরে আধুনিক আবাসন ও রিয়েল এস্টেট খাতের সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিমানবন্দর থেকে প্রায় ২০ মিনিটের দূরত্বে হওয়ায় এ অঞ্চলে চেইন হোটেল, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়বে। একই সঙ্গে রাজধানীর ওপর চাপ কমার পাশাপাশি স্থানীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রকল্পের প্রায় ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও এটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন ডুয়েটের এই অধ্যাপক। তার মতে, প্রকল্পের কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত কিংবা পরিচালনাগত কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। পরিচালন পদ্ধতিতে সমস্যা থাকলে তা পরিবর্তন এবং যান চলাচল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনায় সরকার বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে প্রস্তুত থাকলেও গাজীপুরের বিআরটি চালুর ক্ষেত্রে অনীহা কেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনীহার পেছনে কোনো গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রকল্পে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিগত যানবাহন ও অকার্যকর বাস ব্যবসার স্বার্থ রক্ষাকারীরা বিআরটি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে বিআরটি দ্রুত চালুর জন্য সাত দফা দাবি জানায় গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ প্রকল্প চালুর কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা, নির্মিত অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করা। এ ছাড়া প্রকল্প বাতিল, নির্মিত অবকাঠামো ভেঙে ফেলা কিংবা মূল পরিকল্পনা পরিবর্তনের আগে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবহন মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানানো হয়।
সংগঠনটির অন্য দাবিগুলো হলো—রেল, মেট্রোরেল, স্থানীয় বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সমন্বয় করে সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা; গাজীপুরবাসী, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ; এবং বাস্তবায়নে বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ছাড়া বিআরটি করিডোরের বিকল্প হিসেবে ড্যাপ, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত সালনা-উত্তরা-দৌড় এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর সদরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আফজাল হোসেন কায়সার, গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন সংগঠনের সভাপতি প্রকৌশলী মো. শামসুল হক, পুবাইল আদর্শ কলেজের সহকারী অধ্যাপক মো. আব্দুল লতিফ, গাজীপুর মেট্রো বালিকা কলেজের সভাপতি অধ্যাপক মো. মোখলেছুর রহমান, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির গাজীপুর মহানগর শাখার সভাপতি মো. ফরহাদ হোসাইন এবং গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন সংগঠনের সদস্য মো. আশরাফুল আলম প্রমুখ।
