চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রাম সফরে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে বৈঠককে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হেফাজতের দীর্ঘদিনের আদর্শিক বিরোধকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি সংগঠনটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করতে চাইছে—এমন আলোচনা রয়েছে দলীয় ও রাজনৈতিক মহলে।
আজ রোববার চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত আমিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ২টার দিকে এ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। একই স্থানে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করবেন তিনি।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত জাতীয় নির্বাচনের আগে জামায়াতবিরোধী অবস্থানে সরব ছিল হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির আমির প্রকাশ্যেই বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং জামায়াতকে ভোট না দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। নির্বাচনের পরও দলটির সঙ্গে হেফাজতের দূরত্ব কমেনি। ফলে বিএনপির সঙ্গে সংগঠনটির সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া হেফাজতের কয়েকজন নেতাকেও পরবর্তী সময়ে সংগঠনের কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিএনপি ও হেফাজতের ঘনিষ্ঠতা জামায়াতের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
হেফাজত সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এখনও যেসব মামলা রয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহারের দাবি জানানো হতে পারে। পাশাপাশি ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে হেফাজতের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং কওমি মাদ্রাসাগুলোর কার্যক্রমে সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হতে পারে।
হেফাজতের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে বিভিন্ন ঘটনায় তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিনশ মামলা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এসব মামলার বড় একটি অংশ প্রত্যাহার করা হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও কিছু মামলা প্রত্যাহার হয়েছে। তবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকায় হওয়া বেশ কিছু মামলা এখনও নিষ্পত্তি হয়নি।
হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব আল্লামা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও হেফাজত আমিরের সাক্ষাৎ গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। বৈঠকে সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আসবে। ধর্মীয় ইস্যুতে হেফাজতের অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও আলোচিত হতে পারে।
দেওবন্দি ধারার হেফাজতে ইসলাম ও মওদুদী মতাদর্শে পরিচালিত জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আদর্শিক বিরোধ রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এই বিরোধকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হেফাজত আমিরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তারেক রহমান। অসুস্থতার কারণে তিনি সেখানে যেতে পারেননি। এবার প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জামায়াতের এক নেতা অবশ্য বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, হেফাজতের জামায়াতবিরোধী অবস্থানের পেছনে আদর্শিক কারণ থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি সেটিকে নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করতে পারে।
তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে হেফাজতের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। দলটির এক নেতা বলেন, হেফাজতের বিভিন্ন সমালোচনাকে তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং প্রয়োজন হলে নিজেদের অবস্থান পর্যালোচনা করেন।
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের একসঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবং জাতীয় নির্বাচনেও হেফাজত বিএনপিকে সমর্থন করেছে। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর এই সৌজন্য সাক্ষাৎ।
তাঁর দাবি, সাক্ষাৎকে জামায়াতবিরোধী কোনো কৌশল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি বিএনপি ও হেফাজতের বিদ্যমান সম্পর্কেরই প্রতিফলন।
২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশের পর জাতীয় রাজনীতিতে সংগঠনটির প্রভাব ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ওই সময় বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় সংগঠনটির একটি অংশ আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও বর্তমানে সেই অংশের কার্যক্রম অনেকটাই নিষ্ক্রিয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
