রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী মেডিক্যাল ক্যাম্পে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন ৫ হাজার ৪৩৭ জন শিক্ষার্থী। গত ১১ ও ১২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এ ক্যাম্পে প্রায় ৩৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকার চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। এতে ১৬টি বিভাগে প্রায় ৭০ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের রোগ নির্ণয়ে বিনামূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ পেয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
রাকসুর পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এ ক্যাম্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে ড্রিমার্স কনসালটেশন অ্যান্ড রিসার্চ (ডিসিআর) এবং ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ), রাজশাহী।
আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, দুই দিনের ক্যাম্পে ৩ হাজার ৫৭৭ জন শিক্ষার্থী চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন এবং ১ হাজার ৮৬০ জন বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা করিয়েছেন। নাক-কান-গলা, লিভার, কিডনি, বক্ষব্যাধি, গাইনি ও মেডিসিনসহ ১৬টি বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, রিফ্র্যাকশন টেস্ট ও ফিজিওথেরাপিসহ প্রায় ১৫ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল।
ড্রিমার্স কনসালটেশন অ্যান্ড রিসার্চের (ডিসিআর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম দিনের ক্যাম্পে রোগী পরামর্শ নিয়েছেন ১ হাজার ৪৩৯ জন। এ ছাড়া ৩৮৭ জন রিপোর্ট-সংক্রান্ত পরামর্শ নিয়েছেন। ওই দিন ৫০ জন আলট্রাসনোগ্রাম, ৫৩ জন ইসিজি, ৭৫ জন প্রস্রাব পরীক্ষা এবং ৯৮ জন রক্তে শর্করা পরীক্ষা করিয়েছেন। এছাড়া, ১০ জন HbA1C (রক্ত পরীক্ষা), ১১ জন CRP (যকৃৎ বা লিভার পরীক্ষা), ৫৫ জন TSH (থাইরয়েড পরীক্ষা) এবং ৩২ জন চোখের লেন্সের পাওয়ার পরীক্ষা করিয়েছেন। মাল্টিডিসিপ্লিনারি মেডিকেল বোর্ডের সেবা নিয়েছেন একজন।
প্রতিবেদনে প্রথম দিনের ক্যাম্পে চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য সেবা মিলিয়ে ১৫ লাখ ১২ হাজার টাকার সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দিনের ক্যাম্পে রোগী পরামর্শ নিয়েছেন ২ হাজার ৭১ জন এবং রিপোর্ট-সংক্রান্ত পরামর্শ নিয়েছেন ৮৫০ জন। এ ছাড়া ২৫ জন ফিজিওথেরাপি, ৮৫ জন আলট্রাসনোগ্রাম, ৮৩ জন ইসিজি, ১৬০ জন প্রস্রাব ও কিডনি পরীক্ষা এবং ২৯২ জন রক্তে শর্করা পরীক্ষা করিয়েছেন। এদিন ১৯৫ জন হিমোগ্লোবিন, ২০ জন এইচবিএ-১সি, ২৫ জন সিআরপি, ৮৫ জন টিএসএইচ এবং ৭৫ জন চোখের লেন্সের পাওয়ার পরীক্ষা করিয়েছেন। এছাড়া, তিনজন এমডিডিটি মেডিকেল বোর্ডের সেবা নিয়েছেন।
দ্বিতীয় দিনের ক্যাম্পে ২৪ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ টাকার সেবা দেওয়া হয়েছে বলে ডিসিআরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দিনের হিসাব অনুযায়ী, মোট সেবার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৩৯ লাখ ৫৮ হাজার ৯০০ টাকা।
মেডিক্যাল ক্যাম্পে সেবা নিতে আসা এক শিক্ষার্থী বলেন, “রাকসু শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক ভালো কাজ করছে। মেডিক্যাল ক্যাম্পের উদ্যোগটি তার মধ্যে অন্যতম। আমি তিনটি সমস্যার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছি। চিকিৎসকেরা বেশ সময় নিয়ে আমার কথা শুনেছেন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সম্পর্কে পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের ব্যবহারও ছিল খুবই আন্তরিক। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত নেওয়া উচিত। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট সমাধানেও রাকসুর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “রাকসুর এই উদ্যোগটি শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উপকারী। অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারেন না। মেডিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে তারা সহজেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন। চিকিৎসকেরা আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের কথা শুনছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
মেডিক্যাল ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিসিআরের প্রতিনিধি ড. ইলিয়াস হোসেন বলেন, “শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই একই জায়গায় চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রিপোর্টভিত্তিক পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের পোর্টেবল ল্যাবে পরীক্ষা করে দুই ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেওয়া হবে। রোগীর বয়স, উচ্চতা, ওজন ও ঝুঁকি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে।”
তিনি আরো বলেন, “মূল লক্ষ্য হলো, রোগকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করে জটিলতা ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার ঝুঁকি কমানো। এ লক্ষ্যে ড্রিমার্স কনসালটেশন অ্যান্ড রিসার্চ গত ১৮ বছর ধরে কাজ করছে।”
রাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সালমান সাব্বির বলেন, “আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, একই ছাদের নিচে একটি সমন্বিত ও অস্থায়ী মেডিক্যাল সেন্টারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দেখাতে চেয়েছি, আন্তরিক উদ্যোগ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা থাকলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল সেন্টারের সেবার মান আরো উন্নত করা সম্ভব। এমনকি প্রয়োজনীয় পরীক্ষার রিপোর্টও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেওয়া সম্ভব, যা শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমাতে পারে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আমাদের এ ধরনের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।”
রাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক চিকিৎসাসেবাও ঠিকমতো পান না। সেখানে এক জায়গায় এতগুলো সেবা পাওয়া এবং মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পাওয়া অবিশ্বাস্য।”
রাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করতে চাই। আমরা দোয়া করি, অসুস্থ শিক্ষার্থীরা এই চিকিৎসাসেবার মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠুক।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মতিয়ার রহমান বলেন, “এ ধরনের চিকিৎসা ক্যাম্পের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যারা উন্নত চিকিৎসা নিতে পারেন না, তাদের জন্য এ উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আশা করি, এ ধরনের উদ্যোগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃতি লাভ করবে।”
