ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখরিত পূজামণ্ডপ। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাসে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। দেবী দুর্গার আরাধনা, পুষ্পাঞ্জলি ও প্রতিমা দর্শনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার মণ্ডপে ভিড় করছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। শনিবার (১৭ অক্টোবর) মহাসপ্তমীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, সপ্তমী তিথি দুই দিন ধরে থাকায় আজ রোববারও মহাসপ্তমীর তিথি থাকবে। ফলে দুই দিনজুড়েই পূজা-অর্চনা ও উৎসবের আবহে মুখর থাকবে মণ্ডপগুলো।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে। মহাসপ্তমীর সকালে শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপনের মধ্য দিয়ে দিনের প্রধান আচার সম্পন্ন হয়। কলাগাছ, কচুগাছ, হলুদগাছ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ- এই নয়টি উদ্ভিদ একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। প্রচলিত ভাষায় এটি ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। নবপত্রিকা স্নান ও স্থাপনের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও উদ্ভিদজগতের সঙ্গে দেবী আরাধনার যোগসূত্র তুলে ধরা হয়।
সকালে পূজা শেষে ভক্তরা ফুল ও বেলপাতা দিয়ে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন। দিনভর বিভিন্ন মণ্ডপে মন্ত্রপাঠ, পূজা-অর্চনা, ভোগ নিবেদন ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজন রয়েছে। সন্ধ্যায় ধূপ-প্রদীপের আরতি এবং ঢাক, ঘণ্টা ও শঙ্খধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠবে মণ্ডপের পরিবেশ। আগামীকাল রোববারও সপ্তমী তিথি থাকায় ভক্তরা পূজামণ্ডপে গিয়ে দেবী দর্শন, প্রার্থনা ও অঞ্জলিতে অংশ নিতে পারবেন।
রাজধানীতে উৎসবের আমেজ: রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ বিভিন্ন মণ্ডপে দুর্গোৎসব ঘিরে ভক্তদের সমাগম হচ্ছে। বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কে গুলশান-বনানী পূজা ফাউন্ডেশনের আয়োজনে রয়েছে বিশেষ সাজসজ্জা। এবারের আয়োজনের মূলভাব ‘জলজ’। জীবন, সৃষ্টি ও দিব্য শক্তির উৎস হিসেবে পানির ধারণা থেকে এ ভাবনা নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা মহানগরীতে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ রাখতে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পুলিশি উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। মণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় সিসি ক্যামেরায় নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে তল্লাশির ব্যবস্থা এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষায়িত পুলিশ দলও প্রস্তুত রয়েছে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলা হয়েছে।
খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশালেও পূজার আয়োজন: খুলনা জেলা ও মহানগরের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬। টহল বৃদ্ধি, অস্থায়ী চেকপোস্ট স্থাপন, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শনিবার বেলা ১১টায় খুলনার ধর্মসভা মন্দিরে সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ এসব তথ্য জানান। গত ১৩ অক্টোবর থেকে পূজামণ্ডপগুলোতে বিশেষ টহল কার্যক্রম চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার আড়াই হাজারের বেশি মণ্ডপে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন।
বরিশাল মহানগরীতে ৪৭টি এবং জেলায় ৫৯০টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শনিবার সকালে এসব মণ্ডপে সপ্তমীর পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ঢাকের তালে, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে মণ্ডপগুলো। উৎসবকে ঘিরে প্রতিমা ও মণ্ডপ সাজানো হয়েছে নানা সাজে। বরিশালেও পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে দুর্গোৎসব: বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় মণ্ডপের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার বেড়েছে। উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অনেক মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকেরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোর জন্য সরকারি অনুদান চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর এ সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
পৌরাণিক বিশ্বাসে দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। তাই পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে ভক্তরা পরিবার, সমাজ ও দেশবাসীর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং মঙ্গল কামনা করছেন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দুর্গোৎসব বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যেরও প্রতীক। আগামী ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে।
সানা/আপ্র/১৮/১০/২০২৬
