ক্যানসারের চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার পর কিছু রোগীর শরীরে দেখা দিতে পারে অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। এর মধ্যে অন্যতম হলো গিঁটে ব্যথা, ফোলাভাব ও প্রদাহজনিত বাত।
সমস্যা হলো, একবার কমে যাওয়ার পরও এই ব্যথা বারবার ফিরে আসতে পারে। কখনো কখনো প্রতিবারই আগের চেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এর সম্ভাব্য একটি কারণ খুঁজে পেয়েছেন। তাদের ধারণা, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আগের প্রদাহের স্মৃতি ধরে রাখে এবং পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিক্রিয়া আবার সক্রিয় করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস এমডি অ্যান্ডারসন ক্যানসার সেন্টার ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যানসারের নির্দিষ্ট কিছু ইমিউনোথেরাপির কারণে হওয়া বাতের পুনরাবৃত্তির সঙ্গে রোগপ্রতিরোধী কোষের স্মৃতির সম্পর্ক থাকতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ক্যানসার ইমিউনোলজি রিসার্চ সাময়িকীতে।
কেন হয় প্রদাহজনিত বাত
ইমিউনোথেরাপির একটি ধরন হলো ইমিউন চেকপয়েন্ট ইনহিবিটর। এ ধরনের ওষুধ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ক্যানসার কোষ শনাক্ত করে ধ্বংস করতে সাহায্য করে। তবে কখনো কখনো এই সক্রিয় রোগপ্রতিরোধী কোষ সুস্থ টিস্যুতেও আক্রমণ চালাতে পারে। গিঁট আক্রান্ত হলে ব্যথা, ফোলাভাব ও প্রদাহ দেখা দেয়।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের জটিলতায় আক্রান্ত প্রায় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ রোগীর বাতের সমস্যা বারবার ফিরে আসতে পারে। ইমিউনোথেরাপি শেষ হওয়ার পরও কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর পর্যন্ত উপসর্গ থাকতে পারে।
আগের প্রদাহের স্মৃতি ধরে রাখে কোষ
গবেষকেরা ছয়জন রোগীর গিঁট থেকে নেওয়া তরল নমুনা পরীক্ষা করেন। প্রথমবার বাতের উপসর্গ দেখা দেওয়ার সময় এবং পরবর্তী সময়ে ব্যথা ফিরে আসার সময় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
পরীক্ষায় দুই ধরনের রোগপ্রতিরোধী কোষের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এর একটি হলো প্রদাহ সৃষ্টিকারী সিডি৮ টি কোষ। অন্যটি পিডি-১ ও সিএক্সসিএল১৩ নামের দুটি বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিশেষ ধরনের সিডি৪ টি কোষ।
গবেষকদের ধারণা, প্রথমবার প্রদাহের সময় সক্রিয় হওয়া এসব কোষ পরবর্তী সময়েও থেকে যেতে পারে। ফলে নতুন করে পুরো প্রতিক্রিয়া শুরু না করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা আগের প্রদাহের সঙ্গে যুক্ত কোষগুলোকে আবার সক্রিয় করে। এ কারণেই বাতের ব্যথা বারবার ফিরে আসতে পারে।
কেন ব্যথা আরও তীব্র হতে পারে
গবেষণায় দেখা গেছে, পরবর্তী দফার প্রদাহের সময় এসব রোগপ্রতিরোধী কোষ আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা প্রদাহ বাড়ায় এমন সংকেতবাহী উপাদান বেশি তৈরি করে। পাশাপাশি, সাধারণত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিরিক্ত সক্রিয়তা নিয়ন্ত্রণ করে যে রেগুলেটরি টি কোষ, সেগুলোর মধ্যেও প্রদাহ সৃষ্টিকারী উপাদান তৈরির প্রবণতা দেখা গেছে।
এতে বোঝা যায়, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তাকারী কিছু কোষও উলটো প্রদাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। আক্রান্ত গিঁটে রোগপ্রতিরোধী কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগের নেটওয়ার্কও পরবর্তী প্রদাহের সময় আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ভবিষ্যতে কী কাজে আসতে পারে?
গবেষকদের আশা, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে কোন রোগীর বাতের সমস্যা বারবার ফিরে আসার ঝুঁকি বেশি, তা শনাক্ত করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে এমন চিকিৎসা উদ্ভাবনের পথ খুলতে পারে, যা গিঁটের প্রদাহ কমাবে, কিন্তু ক্যানসারের বিরুদ্ধে ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা নষ্ট করবে না।
তবে গবেষণাটি মাত্র ছয়জন রোগীর নমুনার ওপর করা হয়েছে। তাই ফলাফল নিশ্চিত করতে আরও বড় পরিসরে গবেষণা প্রয়োজন। তারপরও এই অনুসন্ধান ক্যানসারের চিকিৎসার পর দীর্ঘস্থায়ী বাতের ব্যথা কেন ফিরে আসে, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে।
সূত্র: সাইন্স ডেইলি