ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের কিশতওয়ারে এক স্কুলছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন এবং তার গর্ভধারণের ঘটনা গোপন রাখার অভিযোগে ১৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগপত্রে সরকারি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক, দুই চিকিৎসক, জেলা হাসপাতালের দুই কর্মী এবং স্থানীয় এক নেতার নাম রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নীরবতা ও তথ্য গোপন রাখার কারণে কিশোরীর ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা আড়ালে থেকে যায়। পরে সে গর্ভবতী হয়। এরপর গর্ভপাতের চেষ্টা ব্যর্থ হলে মৃত সন্তান প্রসবের সময় তার মৃত্যু হয়।
গত সপ্তাহে জম্মু-কাশ্মীর পুলিশের অপরাধ তদন্ত শাখা এক হাজারের বেশি পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়। কিশতওয়ারের মুনসিফ বিচারকের আদালতে এটি জমা দেওয়া হয়েছে। ওই বিচারক তখন জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্বও পালন করছিলেন।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগপত্রে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে সরকারি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক খালিদ হুসেইনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক রেখা শর্মা, জেলা হাসপাতালের কাছে একটি রোগনির্ণয় ও ইমেজিং কেন্দ্র পরিচালনাকারী চিকিৎসক শফকত শাবির ভবানি এবং স্থানীয় নেতা মনজুর আহমেদের বিরুদ্ধে গর্ভধারণের বিষয়টি পুলিশকে না জানানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধ থেকে শিশুদের সুরক্ষা আইনের (পকসো) আওতায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে জেলা হাসপাতালের আরও দুই কর্মীর নাম রয়েছে। তারা হলেন জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের সঙ্গে যুক্ত জুনিয়র স্টাফ নার্স সোনিকা পারিহার এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী জারিনা বেগম। এ ছাড়া শহরের অন্য একটি স্কুলের শিক্ষক আবদুল লতিফ ভান্ডে এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চত্বরে অবৈধভাবে ওষুধের দোকান চালানোর অভিযোগে হারুন রশিদ মীরের নামও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বাকি অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন খালিদ হুসেইনের দুই ভাই, এক ভগ্নিপতি, এক চাচা এবং তার কয়েকজন আত্মীয় ও সহযোগী। তাঁদের নাম তারিক হুসেইন, ফারুক আহমেদ, গুলাম কাদির শেখ, নূর দিন, পীর বখশ ও মোহাম্মদ ইসহাক।
চিকিৎসক রেখা শর্মা, চিকিৎসক শফকত শাবির ভবানি এবং মনজুর আহমেদ জামিনে রয়েছেন। রেয়াজ নামে এক গাড়িচালককে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি। অন্য অভিযুক্তরা কারাগারে রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
গত ২০ আগস্ট কিশোরীর মৃত্যুর পর সন্দেহজনক মৃত্যুর বিষয়ে পুলিশের কাছে খবর আসে। অভিযোগ, গর্ভপাতের ব্যর্থ চেষ্টার পর তার মৃত্যু হয়েছিল। এরপর পুলিশ মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু করে। কিশোরী ও মৃত নবজাতকের ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস) এবং পকসো আইনে মামলা করা হয়।
কয়েক দিন পর তদন্তের দায়িত্ব অপরাধ তদন্ত শাখার হাতে তুলে দেওয়া হয়। অপরাধ তদন্ত শাখার মহাপরিদর্শক সারা রিজভির তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, কিশোরীর মৃত্যুর মাত্র ১০ দিন আগে স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তার গর্ভধারণের বিষয়টি ধরা পড়ে। কিন্তু খালিদ হুসেইন বিষয়টি যাতে পুলিশের কাছে না পৌঁছায়, সেই ব্যবস্থা করেন। এ জন্য তিনি আত্মীয়স্বজন, সহযোগী এবং স্থানীয় দুই প্রভাবশালী নেতার সহায়তা নেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিষয়টি নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে ফেলা এবং গর্ভপাত করানো।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, কিশোরীর বাবাকে সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পুলিশের কাছে গেলে তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। পাশাপাশি তাকে একটি সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষর করতে চাপ দেওয়া হয়। স্থানীয় ভাষায় এ ধরনের সমঝোতাপত্রকে ‘রাজিনামা’ বলা হয়।
বিশেষ তদন্ত দলের দাবি, তারা ওই সমঝোতাপত্র উদ্ধার করেছে। ফরেনসিক বিজ্ঞান পরীক্ষাগারেও পরীক্ষা করে নথিটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গর্ভপাত করানোর জন্য অর্থের বিনিময়ে কিশতওয়ার জেলা হাসপাতালের কয়েকজন কর্মীর সহায়তা নেওয়া হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, গত ১৯ আগস্ট কিশোরীকে জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তার বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল, যাতে তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
কিশোরীর গর্ভাবস্থা তখন অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় গর্ভপাতের কয়েকটি চেষ্টা ব্যর্থ হয় বলে অভিযোগ। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ডোডার সরকারি মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
সেখানকার চিকিৎসকেরা তার সংকটাপন্ন অবস্থার কারণে জম্মুর সরকারি মেডিকেল কলেজে পাঠানোর পরামর্শ দেন। কিন্তু সেখানে নেওয়ার পথে উধমপুরে তার মৃত্যু হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, কিশোরীকে যে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেটির মালিক ছিলেন খালিদ হুসেইন। ঘটনার প্রমাণ নষ্ট করার উদ্দেশ্যে গাড়িটি ধুয়ে ফেলা হয়েছিল বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ তদন্ত দল জানিয়েছে, মামলার প্রমাণ হিসেবে তারা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, কিশোরীর মা-বাবার জবানবন্দি, ফোনকলের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যাংক ও এটিএমের লেনদেনের নথি, হাসপাতালের কাগজপত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেছে।
তবে কিশোরী ও মৃত নবজাতকের ডিএনএ নমুনার পরীক্ষার ফল এখনো পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে খালিদ হুসেইন ও তার এক ভাইয়ের ডিএনএ নমুনার ফলও অপেক্ষমাণ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব পরীক্ষার ফল হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এমএসএম
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
