২২ মিনিট আগে
সর্বশেষ আপডেট: ২২ মিনিট আগে
স্পোর্টস ডেস্ক
ইতালিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে কত কিংবদন্তিরই না জন্ম হয়েছে। রবার্তো ব্যাজ্জিও, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, ফ্রান্সেসকো টট্টি কিংবা ফিলিপ্পো ইনজাগির মতো তারকারা মাতিয়েছেন ইউরোপের ফুটবল। অথচ তাদের কেউই যা পারেননি, মাত্র ১৯ বছর বয়সে সেটাই করে দেখালেন আলফাদজো সিসে। ইউরোপিয়ান ক্লাব প্রতিযোগিতায় হ্যাটট্রিক করা সর্বকনিষ্ঠ ইতালিয়ান ফুটবলার এখন এসি মিলানের এই তরুণ।
এমন এক সময়ে তার আবির্ভাব, যখন টানা তিন বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়া ইতালি খুঁজছে নতুন দিনের নায়ক। কে এই সিসে, যিনি হঠাৎ করেই আলোচনায় পুরো ইউরোপে?
বৃহস্পতিবার রাতে ইউরোপা লিগে অস্ট্রিয়ার আরবি সালজবুর্গকে তাদের মাঠে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে এসি মিলান। জয়ের নায়ক সিসে। ম্যাচের প্রথম ৪৯ মিনিটেই হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি। বয়স তখন মাত্র ১৯ বছর ৩৫৮ দিন। তাতেই ইউরোপের প্রধান ক্লাব প্রতিযোগিতাগুলোয় সবচেয়ে কম বয়সে হ্যাটট্রিক করা ইতালিয়ান ফুটবলার হয়ে যান এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার।
আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, মাত্র দুই দিন আগেই রেকর্ডটি গড়েছিলেন নিকোলো ত্রেসোলদি। মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে ক্লাব ব্রুজের হয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ২২ বছর বয়সী এই ইতালিয়ান। ভেঙেছিলেন আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরোর প্রায় তিন দশক আগের রেকর্ড। কিন্তু সেই কীর্তি টিকল মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। সালজবুর্গের মাঠে ত্রেসোলদিকেও ছাড়িয়ে গেলেন সিসে।
শুধু তা-ই নয়, মিলানের ২৪ বছরের অপেক্ষাও ঘুচিয়েছেন তিনি। ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগে দেপোর্তিভো লা করুনিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ইনজাগি। এরপর ইউরোপের মঞ্চে মিলানের আর কেউ এক ম্যাচে তিন গোল করতে পারেননি।
সালজবুর্গের বিপক্ষে ১৫ মিনিটে ওমারি হাচিনসনের ক্রসে হেডে প্রথম গোল করেন সিসে। ৩২ মিনিটে দাভিদে বার্তেসাগির পাস থেকে বাঁ পায়ের শটে দ্বিতীয় গোল। বিরতির পর ৪৯ মিনিটে আদ্রিয়াঁ রাবিওর ক্রসে আবারও হেডে গোল করে পূর্ণ করেন ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক। পরে গনসালো রামোসের গোলে ৪-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করে মিলান।
অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেও ইতালির দ্বিতীয় বিভাগে খেলছিলেন এই তরুণ। তার উঠে আসার গল্পটাও বেশ আকর্ষণীয়।
২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর ইতালির ত্রেভিসো শহরে জন্ম সিসের। মা-বাবা দুজনই পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি থেকে ইতালিতে এসেছিলেন উন্নত জীবনের আশায়। বাবা সালুসি শ্রমিক, মা হাবিবাতু হোটেলকর্মী। অভাবের সংসারেও ছেলের ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণে চেষ্টার কমতি রাখেননি তারা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে লা রিপুবলিকাকে সিসে জানিয়েছিলেন, তার বাবা সারা দিন কাজ করে ক্লান্ত শরীরেই তাকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন। মায়ের সঙ্গে কখনো দীর্ঘ পথ হেঁটে, কখনো বাসে চড়ে মাঠে যেতে হতো। সেই সংগ্রামই তাকে আরও দৃঢ় করেছে। প্রত্যাশা, তাদের যেন আর কঠোর পরিশ্রম করতে না হয়।
ত্রেভিসোর স্থানীয় ক্লাবে ফুটবলে হাতেখড়ি সিসের। এরপর জর্জিওনে হয়ে যোগ দেন হেলাস ভেরোনার একাডেমিতে। ২০২৩-২৪ মৌসুমে ভেরোনার যুবদলের হয়ে ১৬ গোল করেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে সিরি আয় অভিষেক হয় তার।
গত মৌসুমে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেতে ধারে যোগ দেন দ্বিতীয় বিভাগের কাতানজারোতে। সেখানেই নজর কাড়েন বড় ক্লাবগুলোর। একপর্যায়ে নেদারল্যান্ডসের পিএসভিতে যোগ দেওয়া প্রায় নিশ্চিত ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রস্তাব আসে মিলানের। ফেব্রুয়ারিতে তাকে কিনে নেয় ইতালিয়ান ক্লাবটি।
চোট কাটিয়ে নতুন মৌসুমে মিলানের মূল দলে যোগ দিয়েই নিজের প্রতিভার প্রমাণ দিতে শুরু করেন সিসে। তোরিনোর বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে গোল, এরপর জুভেন্তাসের বিপক্ষেও জালের দেখা পান। এবার তো ইউরোপে ইতিহাস।
মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হলেও গোল করার দক্ষতা তার বড় শক্তি। গতি, ড্রিবলিং ও প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে গোল করার ক্ষমতা তাকে আলাদা করেছে। আদর্শ মানেন লিওনেল মেসি ও পল পগবাকে।
জাতীয় দলের জার্সি এখনও না পেলেও এরমধ্যেই ইতালির বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে আলো ছড়াচ্ছেন সিসে। চলতি মাসের শুরুতেই অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোর বাছাইপর্বে আর্মেনিয়ার বিপক্ষে যোগ করা সময়ে জয়সূচক গোল করেছিলেন তিনি।
এই সাফল্য ইতালিয়ান ফুটবলের জন্যও আশার খবর। ২০০৬ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জেতার পর আর সেভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি আজ্জুরিরা। ২০১৮ ও ২০২২ সালের পর ২০২৬ বিশ্বকাপেও জায়গা হয়নি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। একসময় বিশ্ব ফুটবল শাসন করা দেশটিতে এখন নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার তাগিদ।
সেই জায়গা থেকেই সিসেকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে পারেন ইতালিয়ানরা। যদিও মাত্র কয়েকটি ম্যাচের পারফরম্যান্স দিয়ে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা কঠিন। ধারাবাহিকতা ধরে রাখা এবং নিয়মিত খেলার সুযোগ পাওয়াই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
