বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ ১৯ অক্টোবর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। একদিকে শারদীয় দুর্গাপূজার ঢাকের আওয়াজ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা কিছু কঠোর ও মানবিক বার্তা – সব মিলিয়ে আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গতকাল রাতে রাজধানীর মহাখালী ও গুলশান-বনানী পূজা মণ্ডপ পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে কথাটি বলেছেন, তা গত ১৫ বছরে কোনো প্রধানমন্ত্রীর মুখে এভাবে শোনা যায়নি। তিনি বলেছেন, “দেশ গড়ার সংগ্রামে আমরা ধর্ম দেখব না, দেখব কে এ দেশের নাগরিক।”
এটি একটি সাধারণ শুভেচ্ছা বক্তব্য নয়, এটি রাষ্ট্রদর্শন। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন – ১৯৭১ এ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানেও আমরা ধর্ম দেখিনি। আজ যখন দেশজুড়ে প্রায় ৩৩ হাজার মণ্ডপে পূজা হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রপ্রধানের এই বার্তা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য শুধু নিরাপত্তা নয়, সম্মানেরও বার্তা।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সাভার সেনানিবাসে। আজ প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ (OROP) বাস্তবায়নের কাজ চলছে। এটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ছিল। একটি সরকার যখন একই দিনে মন্দিরে গিয়ে সম্প্রীতির কথা বলে এবং সেনানিবাসে গিয়ে সৈনিকের ভবিষ্যতের কথা বলে – তখন বোঝা যায়, সরকার জনগণ ও রাষ্ট্রযন্ত্র – দুটোকেই একসাথে সামলাতে শিখেছে।
তৃতীয় বিষয়টি আন্তর্জাতিক। গত ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত ব্রিটিশ হোম অফিসের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ এর অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়েছে, রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজ আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে। তবে সংস্কার বাস্তবায়ন ধীর এবং দুর্নীতি ও পুলিশের জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ এখনো আছে। এই রিপোর্টটি তারেক রহমান সরকারের জন্য একটি আয়না। প্রশংসা যেমন আছে, সতর্কবার্তাও আছে।
আজকের এই তিনটি ঘটনা একই সূত্রে গাঁথা – রাষ্ট্রকে ধর্মের ঊর্ধ্বে তুলে নাগরিকের রাষ্ট্র বানানো, বাহিনীকে পেশাদার ও নিরাপদ করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেকে যাচাই করা।
এটাই ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষ চেয়েছিল। ক্ষমতার প্রদর্শনী নয়, দায়িত্বশীলতার রাজনীতি।
লেখক: রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিক ও রাষ্ট্রচিন্তক।
