মো. আব্বাস
‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমায় পল রুসেসাবাগিনা নিজের হোটেলে আশ্রয় দিয়ে শত শত মানুষের জীবন বাঁচান। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় তুতসি জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো গণহত্যার ভয়াবহতা এই সিনেমায় উঠে এসেছে। কিন্তু বেঁচে যাওয়া সবার গল্প কি সেখানে বলা হয়েছে? বিশেষ করে সেই নারীদের কথা, যারা ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার পরও প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন? তাদের জন্য বেঁচে থাকাটাই ছিল প্রথম লড়াই। এরপর শুরু হয় অপরাধের স্বীকৃতি আদায় এবং বিচার পাওয়ার সংগ্রাম।
এই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে আছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী ও বিচারক নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। গণহত্যার শিকার নারীদের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তার দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালে নাভি পিল্লাইকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন থেকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন—গণহত্যার শিকার নারীদের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক আইনের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত করা বিচারক নাভি পিল্লাই।
নাভি পিল্লাই ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডায় যোগ দেন। তার কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জ্যঁ-পল আকায়েসুর মামলা। তাবা এলাকার মেয়র আকায়েসুর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু বিচার শুরুর সময় অভিযোগপত্রে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ ছিল না। আদালতে নারীদের সাক্ষ্য সামনে আসার পর বিষয়টি বদলে যায়। ১৯৯৭ সালের জুনে ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউটরকে অভিযোগপত্র সংশোধনের অনুমতি দেয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল পাঁচজন সাক্ষীর বক্তব্য, যারা তাবা কমিউন অফিসে আশ্রয় নেওয়া নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার কথা জানিয়েছিলেন।
সাক্ষী ‘জেজে’ আদালতে বলেন, হামলাকারীরা তার বাড়ি ধ্বংস করার পর তিনি শিশুসন্তানকে নিয়ে আশ্রয় খুঁজছিলেন। তার ছোট বোনকে মিলিশিয়ারা হত্যা করে। পরে তাবার প্রশাসনিক কার্যালয়ে আশ্রয় নেওয়া নারীদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হতো। জেজে নিজেও ধর্ষণের শিকার হন। আদালতে তিনি আরও বলেন, কিছু নারীর বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর; তাদের একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। কয়েকজনকে পরে হত্যা করা হয়, কারও মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এই সাক্ষ্যগুলো কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির বিবরণ ছিল না। সাক্ষ্যগুলো স্পষ্ট প্রমাণ করেছে—আশ্রয় খুঁজতে আসা নারীরাও নিরাপদ ছিলেন না, আর স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতেই অপরাধ চলছিল।
এই সাক্ষ্যগুলোর ভিত্তিতে মামলাটি নতুন দিকে মোড় নেয়। ১৯৯৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল আকায়েসুকে গণহত্যা, ধর্ষণসহ নয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারক লায়তি কামা, লেনার্ট আসপেগ্রেন এবং নাভি পিল্লাই ছিলেন রায় দেওয়া তিন সদস্যের প্যানেলে। রায়ে বলা হয়, কোনো জাতিগত বা অন্য সুরক্ষিত জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা সংঘটিত হলে তা গণহত্যার অংশ হতে পারে। আদালত আরও ব্যাখ্যা করে, যৌন সহিংসতা শুধু শারীরিক আক্রমণে সীমাবদ্ধ নয়; ভয়, হুমকি ও জবরদস্তির পরিস্থিতিতেও তা সংঘটিত হতে পারে।
রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, আদালত যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার মূল প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকার করে। রায়ে বলা হয়, তুতসি নারীদের ওপর যৌন সহিংসতা ছিল তাদের এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই স্বীকৃতি নারীদের অভিজ্ঞতাকে অপরাধের প্রান্তিক বিবরণ হিসেবে না দেখে, গণহত্যা কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল তা বোঝার কেন্দ্রীয় প্রমাণে পরিণত করে। পিল্লাই পরে রায় ঘোষণার পর বলেন, “অনেক কাল ধরেই ধর্ষণকে যুদ্ধের পরিণতি হিসেবে দেখা হয়েছে। এখন একে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। আমরা শক্ত বার্তা দিতে চাই, ধর্ষণ আর যুদ্ধের ট্রফি নয়।”
এই বক্তব্যের তাৎপর্য বোঝা যায় নারীদের সাক্ষ্য দেওয়ার কঠিন বাস্তবতা থেকে। যৌন সহিংসতার শিকার কাউকে আদালতে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে হলে ঘটনার স্মৃতি আবার সামনে আনতে হয়। প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়, কখনো নিজের সমাজের অপমান ও দোষারোপের ভয়ও সামলাতে হয়। আকায়েসু মামলার নথিতে প্রসিকিউশন স্বীকার করেছিল, যৌন সহিংসতার প্রমাণ আগে যথেষ্টভাবে সামনে না আসার পেছনে লজ্জা এবং তদন্তকারীদের সংবেদনশীলতার অভাব ভূমিকা রাখতে পারে। আদালতও উল্লেখ করে, এ ধরনের অপরাধের তদন্ত ও বিচার ন্যায়বিচারের স্বার্থেই জরুরি।
পিল্লাইয়ের কাছে সাক্ষীর মর্যাদা ও সুরক্ষার প্রশ্নটি শুধু তাত্ত্বিক ছিল না। ২০০১ সালে ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ধর্ষণের সাক্ষ্য দেওয়া এক নারীর প্রতি আদালতের আচরণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ওঠা অভিযোগের জবাব দেন। শুনানির অডিও-ভিডিও রেকর্ড পর্যালোচনা করে তিনি বলেন, বিচারকরা সাক্ষীকে নিয়ে হাসাহাসি করেছেন বলে যে বর্ণনা ছড়িয়েছিল, তা রেকর্ডের সঠিক চিত্র নয়। তিনি জানান, বিচারকরা জেরাকে প্রাসঙ্গিক ও নির্দিষ্ট রাখার চেষ্টা করেছিলেন এবং সাক্ষীর প্রতি সংবেদনশীল থাকার কথাও আইনজীবীদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে পিল্লাই বলেন, সাক্ষীদের দুর্ব্যবহার থেকে রক্ষা করার উদ্বেগ সবারই থাকা উচিত; তবে তথ্য যাচাই না করে সংবাদ প্রকাশ করলে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
এই ঘটনাটি নাভি পিল্লাইকে নির্ভুল নায়ক হিসেবে দেখানোর জন্য নয়, যৌন সহিংসতার বিচার কতটা কঠিন তা দেখানোর জন্য। আদালতকে একদিকে সাক্ষীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, অন্যদিকে অভিযুক্তের ন্যায্য বিচারের অধিকারও রক্ষা করতে হয়। বিচারপ্রক্রিয়ায় নারীর বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া মানে প্রমাণ যাচাই বন্ধ করা নয়; এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সাক্ষী অপমানের ভয় ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতা বলতে পারেন।
১৯৪১ সালে ডারবানে জন্ম নেওয়া পিল্লাই বর্ণবাদী দক্ষিণ আফ্রিকায় বেড়ে ওঠেন। ১৯৬৭ সালে তিনি নাটাল প্রদেশে নিজের আইন চেম্বার প্রতিষ্ঠা করেন এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীদের পক্ষে কাজ করেন। পরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাই কোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারক হন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তবে তার কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকারগুলোর একটি হলো, গণহত্যার শিকার নারীদের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক আইনের আলোচনায় দৃশ্যমান করা।
‘হোটেল রুয়ান্ডা’ সিনেমায় আমরা দেখি, গণহত্যার সময় কাউকে আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচানো যায়। আকায়েসু মামলার নারীদের সাক্ষ্য মনে করিয়ে দেয়, আশ্রয় পাওয়ার পরও বেঁচে যাওয়া মানুষের লড়াই শেষ হয় না। তাদের কথা শুনতে হয়, তাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের স্বীকৃতি দিতে হয় এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হয়। গণহত্যার ইতিহাসে নারীদের অভিজ্ঞতা বাদ দিলে সেই ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শান্তিও অসম্পূর্ণ থাকে, যদি ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যকে স্বীকৃতি না দেওয়া হয় এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় না আনা হয়। যেমনটা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নাভি পিল্লাইদের লড়াই কেবল রুয়ান্ডার নারীদের জন্য নয়, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বীরাঙ্গনাদের ইতিহাস এবং অধরা বিচারকেও সমান্তরালভাবে সামনে নিয়ে আসে। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে দুই লাখেরও বেশি বাঙালি নারী বর্বরোচিত যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। রুয়ান্ডার আকায়েসু মামলার রায় যেমন প্রমাণ করেছে যে যৌন সহিংসতা কোনো যুদ্ধের সাধারণ অপরাধ নয়—একটি পুরো জাতিকে মানসিকভাবে ধ্বংস করার পরিকল্পিত ‘গণহত্যা’, ঠিক একইভাবে একাত্তরে বাঙালি নারীদের করে তোলা হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদারদের জাতিগত দমন-পীড়নের প্রধান অস্ত্র। দীর্ঘ দিন ধরে বীরাঙ্গনাদের নীরব আত্মত্যাগ ও সমাজ থেকে পাওয়া অপমান কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি হয়েই রয়ে গেছে; আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার সেই স্বীকৃতি পেতে আজও ইতিহাসের পাতায় সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে। রুয়ান্ডা থেকে বাংলাদেশ—সময় ও সীমানা ভিন্ন হলেও ইতিহাস কোনো গণহত্যার বিচারই পূর্ণতা পায় না, যতক্ষণ না সেখানে নারীদের বিরুদ্ধে ঘটা যৌন অপরাধের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত হয়।
মো. আব্বাস: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও যোগাযোগ পেশাজীবী। ই-মেইল: abdulla180395@gmail.com
