চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকার অদূরে সাভারের আশুলিয়ায় সাতজনকে হত্যার পর ছয়জনের মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হওয়া পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) শেখ আবজালুল হক কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। গত ১৩ অক্টোবর সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২ থেকে তিনি মুক্তি পান।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) তার কারামুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়ায় তাকে ক্ষমা করে খালাস দেওয়া হলেও অন্য একটি মামলা বিচারাধীন থাকায় এত দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল তাকে। পরে ওই মামলায় জামিন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মুক্তি দেওয়া হয়।
কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর ডেপুটি জেলার মো. আফতাবুজ্জামান জানান, আবজালুল হকের জামিনের কাগজপত্র পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা, ঢাকার প্রসিকিউশন, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, গাজীপুরের ডিসি প্রসিকিউশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে তথ্য পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট সব দপ্তর থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় আগেই তার মুক্তির আদেশ কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু আশুলিয়া থানার অন্য একটি মামলা বিচারাধীন থাকায় তখন তাকে ছাড়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ওই মামলায় জামিন পাওয়ার পর তার কারামুক্তি নিশ্চিত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন আশুলিয়া থানার সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি, হত্যাকাণ্ড এবং ছয়জনের মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে করা এ মামলাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, সেদিন সাতজনকে হত্যা করা হয়।
পরে তাদের মধ্যে ছয়জনের মরদেহ একটি ভ্যানে স্তূপ করে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম, সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও যুক্তিতর্ক শেষে গত ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায় ঘোষণা করেন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন আশুলিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল মালেক, সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বিশ্বজিৎ সাহা, কনস্টেবল মুকুল চোকদার এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূইয়া।
একই মামলায় সাত পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন ঢাকা রেঞ্জের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান রিপন, ঢাকার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) আব্দুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহিদুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশনস) নির্মল কুমার দাস এবং ঢাকা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন। এ ছাড়া এসআই আরাফাত উদ্দিন ও এএসআই কামরুল হাসানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় শেখ আবজালুল হককে ক্ষমা করে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ১৫ ধারার বিধান অনুযায়ী, অপরাধের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি নিজের জানা ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও সত্য তথ্য প্রকাশের শর্তে ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এ ধরনের সাক্ষীকে রাজসাক্ষী বা ‘অ্যাপ্রুভার’ বলা হয়।
তবে রাজসাক্ষী হওয়ার ক্ষেত্রে শুধু নিজের দোষ স্বীকার করাই যথেষ্ট নয়; তাকে ঘটনার বিষয়ে সত্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হয় এবং বিচারিক কার্যক্রমে সাক্ষ্য দিতে হয়। শেখ আবজালুল হক এ মামলায় প্রথমে আসামি ছিলেন। পরে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সত্য প্রকাশের শর্তে ক্ষমা চেয়ে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন।
ট্রাইব্যুনাল তার আবেদন মঞ্জুর করেন এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। এরপর ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর মামলার ২৩তম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন তিনি। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় শহীদ পরিবারগুলোর কাছে ক্ষমা চান আবজালুল। একই সঙ্গে দাবি করেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশের মুখে তার কিছু করার ছিল না।
জবানবন্দিতে আবজালুল হক বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আশুলিয়া এলাকায় ছাত্র-জনতা বিজয় মিছিল বের করেন। মিছিলটি আশুলিয়া থানার দিকে এগিয়ে এলে তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনির নির্দেশে বিশ্বজিৎ সাহাসহ দুজন গুলি চালান বলে তিনি দাবি করেন।
তার এই বক্তব্য মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে জবানবন্দিতে দেওয়া বক্তব্য ছিল তার নিজের বর্ণনা; মামলার অন্যান্য সাক্ষ্য, নথি ও প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিষয়ে রায় ঘোষণা করেন।
জবানবন্দির পর আবজালুলকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান। জেরায় আবজালুল জানান, ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার অস্ত্রাগারের দায়িত্বে থাকা এসআই আউয়ালের কাছে তিনি নিজের অস্ত্র ও গুলি জমা দেন। ৫ আগস্ট তার নামে ইস্যু করা ১০টি গুলিও জমা দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া ৫ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বলে জেরায় উল্লেখ করেন। ১৫ আগস্ট অস্ত্র জমা দিতে গিয়ে আশুলিয়া থানার ভেতরে এলোমেলো পরিস্থিতি দেখতে পান বলেও জানান আবজালুল।
মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে রাজসাক্ষীকে জেরা করা নিয়ে একপর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান জানতে চান, আশুলিয়া থানায় এএসআই রাজু আহমেদের মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে আবজালুল কিছু শুনেছিলেন কি না। এ প্রশ্নের বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম।
তার বক্তব্য ছিল, রাজসাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, তবে প্রশ্নের ধরন ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রশ্নটি করার অধিকার নিয়ে যুক্তি দেন এবং নিহত পুলিশ সদস্যের পরিবারের আবেদনের বিষয়টি সামনে আনেন। এ সময় সাফাই সাক্ষীর তালিকা ও সংশ্লিষ্ট নথি উপস্থাপন নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বাদানুবাদ হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ট্রাইব্যুনাল অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিচারকেরা উভয় পক্ষের আইনজীবীদের আদালতের পরিবেশ বজায় রাখা এবং আইন অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন।
মামলার নথি ও প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন সাভারের আশুলিয়া থানার সামনে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে সজল, আস সাবুর, তানজীল মাহমুদ সুজয়, বায়েজিদ বোস্তামী, আবুল হোসেন, ওমর ফারুক ও মোহাম্মদ শাহাবুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। পরে সাতজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে এবং ছয়জনের মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, মরদেহগুলো একটি ভ্যানে স্তূপ করে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়া হয়েছিল। ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি ওঠে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০২৫ সালের ২ জুলাই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। ওই বছরের ২১ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।
বিচার চলাকালে সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা ও অন্যান্য বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০২৬ সালের ২০ জানুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। পরে ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এসব অপরাধের উদ্দেশ্য শুধু মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়া নয়; জনসাধারণের মনে চরম আতঙ্ক ও ভীতি সৃষ্টি করা, ভিন্নমত দমন করা এবং ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে আধিপত্য বজায় রাখাও এর উদ্দেশ্য ছিল।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ আবজালুল হক দ্বিতীয় পুলিশ সদস্য হিসেবে রাজসাক্ষী হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার জবানবন্দি, জেরা এবং পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনালের রায় মামলাটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে রাজসাক্ষী হিসেবে ক্ষমা পেয়ে খালাস পাওয়ার বিষয়টি অন্য আসামিদের সাজা থেকে পৃথক। ট্রাইব্যুনাল প্রত্যেক আসামির বিষয়ে পৃথক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
আবজালুল হকের কারামুক্তির ঘটনা আলোচিত এ মামলার বিচার-পরবর্তী পরিস্থিতিকে নতুন করে সামনে এনেছে। ট্রাইব্যুনালে ক্ষমা ও খালাস পাওয়ার পরও অন্য মামলায় বিচারাধীন থাকার কারণে তার মুক্তি বিলম্বিত হয়েছিল।
পরে ওই মামলায় জামিন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ছাড়পত্র পাওয়ার পর তিনি কারাগার থেকে বের হন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আশুলিয়ার এ মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে রয়েছে।
