আসার সময় শ্যালকের হাত ধরে বলে এসেছিলাম, আপু ও ফাইজানকে ভালোভাবে নিয়ে এসো। আমি ফিরে আসার সময় আমার ছেলেটা চিপস খেতে চেয়েছিল, একটা চিপস দিয়ে আসছিলাম। কে জানত, ওদের সঙ্গে এটাই শেষ দেখা, শেষ কথা হবে!
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নূর আলম। সাত বছরের একমাত্র সন্তান মো. ফাইজান নূরের হাতে একটি চিপস তুলে দিয়ে স্ত্রী ফারিহা কবিরসহ পরিবারের সদস্যদের কক্সবাজারে রেখে কর্মস্থলে ফিরেছিলেন তিনি। বিদায় নেওয়ার সময় শ্যালক নাফিসের হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন, বোন ও ভাগ্নেকে যেন ভালোভাবে নিয়ে আসেন। নূর আলমের আফসোস, তার কথা রাখতে গিয়ে হয়তো শ্যালক নাফিস বোন ও ভাগ্নেকে একা রেখে নিজে বের হননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আগুনের ভয়াবহতা থেকে তাদের রক্ষা করতে পারেননি।
আরও পড়ুন
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালকসহ পরিবারের নয়জনকে রেখে কর্মস্থলে ফিরেছিলেন একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করা নূর আলম। শনিবার (১৭ অক্টোবর) ভোরে ওই রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

নূর আলম জানান, এই দুর্ঘটনায় মারা গেছে তার পরিবারের ছয়জন। যদিও মরদেহ শনাক্ত করা এখনো সম্ভব হয়নি। ঢাকা পোস্টের কাছে সেই ভয়াবহ সময়ের কথা বলতে গিয়ে বারবার থমকে যাচ্ছিল নূর আলমের কণ্ঠ। চোখের পানি মুছে আবার চেষ্টা করছিলেন স্বজনদের শেষ মুহূর্তগুলোর কথা বলতে।
নূর আলমের ধারণা, সকালে নাশতার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় রিসোর্টের রান্নাঘরে আগুনের সূত্রপাত হয়। গ্যাস সিলিন্ডারের সমস্যার কারণে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এরপরই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তা। তার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, রিসোর্টের ওই ভিলা থেকে বের হওয়ার জন্য বিকল্প কোনো পথ বা জরুরি গেট (ইমার্জেন্সি এক্সিট) ছিল না। অতিরিক্ত কোনো এক্সিট পয়েন্ট না থাকায় তারা বের হতে পারেননি।
নূর আলমের মতে, বের হওয়ার বিকল্প পথ থাকলে আরও কয়েকজনের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো। তার ভাষায়, ‘যদি এক্সিট পয়েন্ট থাকত, হয়তো বাকি পাঁচজনই বের হতে পারত। হয়তো আমার ওয়াইফ বের হতে পারত না, কিন্তু আমার বাচ্চাটা বেঁচে যেত, বোনগুলো বেঁচে যেত। এই তো, আর কী বলব!’
নিজের ফিরে আসার প্রেক্ষাপট জানিয়ে নূর আলম বলেন, ‘আমি আগের দিন চলে আসি। ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করি তো, দুই দিনের ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমার রিপোর্টিং ছিল। শনিবার সকাল ৮টার দিকে আমার মামা ফোন দিয়ে জানতে চান, আমি কোথায় আছি এবং কক্সবাজারের কোনো খবর শুনেছি কিনা বা ওদের গাড়িতে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। আমি তাকে বললাম, ওদের তো ১০টার দিকে গাড়ি। সাড়ে ৯টার দিকে ওরা রিসোর্ট থেকে চেক আউট করে বের হবে।’
এরপর স্বজনদের ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন নূর আলম। একে একে ফোন করতে থাকেন রিসোর্ট ও আশপাশের হোটেলগুলোতে। চেষ্টা করেন রিসেপশনেও। এরপর জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দিলেও স্বজনদের প্রকৃত অবস্থা বা পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। পরে অনলাইনে খুঁজে স্থানীয় পুলিশের একটি নম্বর বের করে ফোন দিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান। পুলিশ থেকে তাকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, ‘আমরা দেখতেছি, ফায়ার সার্ভিস পাঠাইছি, আপনি ঠান্ডা থাকেন।’
নূর আলম আক্ষেপ করে বলেন, ‘পরবর্তীতে তো সব শেষ হয়ে গেছে, ৩০ মিনিটের মধ্যেই সব শেষ। ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে।’
এই দুর্ঘটনার পর নূর আলমের পরিবারের তিন সদস্যকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনজন অনেক কষ্টে আগুন থেকে বের হতে পেরেছিলেন। তারা একই কক্ষে ছিলেন বলেই বের হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন । নিজে সেখানে থাকলে স্বজনদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে পারতেন এমন ভাবনাও নূর আলমকে প্রতি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওরা তিনজন একই রুমে ছিল বিধায় জানালা ভেঙে বের হতে পারছে। ওই পাশের রুমে যদি অন্তত আরেকজন থাকতে পারত, তাহলে হয়তো আমার স্ত্রী-সন্তান বাঁচতে পারত। আর আমি থাকতে পারলে আমি হয়তো চেষ্টা করতাম।’
কক্সবাজার থেকে ফেরার স্মৃতিচারণ করে নূর আলম জানান, আসার সময় শ্যালক নাফিস তাকে স্কুটিতে করে বাসস্টপে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বিদায় নেওয়ার সময় শ্যালকের হাত ধরে স্বজনদের নিরাপদে নিয়ে আসার আকুতি জানিয়েছিলেন।
নূর আলম মতে, ‘আমার শ্যালক নিজে চাইলে বাঁচতে পারত। কিন্তু আমার কথা রাখতে গিয়ে, বোন আর ভাগ্নেকে বাঁচাতে গিয়ে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। সে হয়তো ওদের বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কাউকে বের করতে পারেনি।’
স্ত্রীর সঙ্গে শেষ কথোপকথনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ফিরে আসার পর রাত সোয়া ১১টার সময় স্ত্রী ফোন দিয়েছিল আমি ঠিকমতো পৌঁছেছি কি না জানতে। সেটিই ছিল তার সঙ্গে আমার শেষ কথা। আসার সময়ে স্ত্রী পাশের বাসার ভাবিদের জন্য কিছু উপহার কিনতে টাকা চেয়েছিল। তখন টাকা না থাকায় দিতে পারিনি। পরে বাসস্ট্যান্ডে বসে শ্যালকের কাছে টাকা দিয়ে এসেছিলাম, যেন তার বোনকে নিয়ে কেনাকাটা করতে পারে।’
নূর আলম জানান, তিনি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে লাশ শনাক্তের জন্য এরইমধ্যে সিআইডি অফিসে গিয়ে রক্তের নমুনা দিয়েছেন।
চোখের জল মুছতে মুছতে কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কখন নাগাদ রিপোর্ট পাব এবং স্ত্রী ও আদরের সন্তানের লাশ ছুঁয়ে দেখতে পারব, সেটা এখনো বলতে পারছি না।’
এমএল/এমএসএ
