সাংবাদিকদের আবাসনের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) বরাদ্দ দেওয়া ৪০ দশমিক ৬২ কাঠা জমি বিক্রির উদ্যোগে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জমিটির বায়নানামায় মূল্য দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা, যদিও প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৪৫ কোটি টাকা বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এ ছাড়া মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে খোলা একটি ব্যাংক হিসাবে এক বছরের কম সময়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে গতকাল রোববার (১৮ অক্টোবর) জমি বিক্রি ও হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন চট্টগ্রামের পঞ্চম সিনিয়র সিভিল জজ আদালত। একই সঙ্গে সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়ে বিবাদীদের ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের (চমেসাস) নামে বরাদ্দ দেওয়া এই জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, সমিতির ৩৮ জন সদস্যকে বঞ্চিত করে, সমবায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই এবং জমি বরাদ্দের শর্ত উপেক্ষা করে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বায়নানামায় জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, জমিটির বিক্রয়মূল্য ৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি, আরেকটি হিসাবে এর মূল্য ৭০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। জমির বায়না বাবদ ১৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।

জমিটি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে এর নিবন্ধন ও হস্তান্তর বন্ধ রাখতে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে সিডিএ চেয়ারম্যান, সাবরেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার, নিবন্ধন মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের বক্তব্য, সমবায় মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়া সমিতির এই জমি বিক্রির আইনগত সুযোগ নেই। অথচ গত ৩ ফেব্রুয়ারি জমি বিক্রির বায়নানামা নিবন্ধন করা হয়েছে।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খায়েরুন্নেছা আকতার আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ৮৪/২০২৬ নম্বর মামলায় রোববার নথি উপস্থাপন করে জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞার আবেদন জানানো হয়। আদালত আবেদনটি বিবেচনায় নিয়ে তফসিলে বর্ণিত সম্পত্তি হস্তান্তর না করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বিবাদীদের ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
৪৩ সদস্যের আবেদনে বরাদ্দ, ফ্ল্যাট পাওয়ার কথা ছিল সবার
সমিতির সদস্য সাংবাদিকদের ভাষ্য, ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম নগরের কল্পলোক আবাসিক এলাকায় প্রধান সড়কের পাশে ৪০ দশমিক ৬২ কাঠা জমি বরাদ্দ দেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। এর আগে চট্টগ্রাম শহরে নিজেদের বসবাসের কোনো জমি নেই বলে দাবি করে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অঙ্গীকারনামা দিয়েছিলেন সমিতির ৪৩ জন সদস্য। তাঁরা গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছে জমি বরাদ্দের আবেদন করেন।
ওই আবেদন বিবেচনায় নিয়ে সমিতির সদস্যদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণের শর্তে জমি বরাদ্দ দিতে সিডিএকে নির্দেশ দেয় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। পরে ২০০৬ সালের ২২ অক্টোবর দেওয়া বরাদ্দপত্রে জমির শ্রেণি উল্লেখ করা হয় ‘ব্লক অ্যাপার্টমেন্ট’। বরাদ্দের শর্ত অনুযায়ী, জমিতে ভবন নির্মাণ করে সদস্যদের মধ্যে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিতে হবে। ভবনের নকশা সিডিএর অনুমোদন নিতে হবে। নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ ও প্রয়োজনীয় দলিল সম্পাদনের পর আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ছিল।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জমিটি কেবল আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের শর্তে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। খালি জমি হিসেবে বিক্রি করার সুযোগ ছিল না। তবে সমিতির অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে দীর্ঘদিনেও সেখানে ভবন নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি জমি বিক্রির উদ্যোগ নেয়।
সমিতির মোট সদস্য ১০৫ জন। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁদের মধ্যে ৬৭ জনকে আবাসন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত দেখিয়ে বায়নার টাকা ওই সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে বাকি ৩৮ জন সদস্য বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ৬৭ জনের অন্তর্ভুক্তি ও অর্থ বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে সমিতির সদস্যদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে।
সদস্যদের একাংশের অভিযোগ, জমি বিক্রি হলে যাঁরা ফ্ল্যাট পাওয়ার আশায় ছিলেন, তাঁরা আবাসনের সুযোগ হারাবেন। জমি বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হবে, কারা কত টাকা পাবেন এবং সব সদস্যের স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করা হবে, সে বিষয়ে তাঁদের স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি।
২৫ কোটির বায়নানামা, ১৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ ফেব্রুয়ারি জমি বিক্রির বায়নানামা নিবন্ধন করা হয়। দলিল নম্বর ৬৪৮/২০২৬। এতে জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ কোটি টাকা অগ্রিম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে নতুন অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, জমিটির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য ৫০ কোটি টাকার কাছাকাছি। অন্য একটি হিসাবে জমিটির মূল্য ৭০ কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে বায়নানামায় উল্লেখ করা ২৫ কোটি টাকার সঙ্গে অভিযোগে বলা মূল্যগুলোর বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এসব মূল্যদাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
জমির বায়না বাবদ ১৭ কোটি টাকা ইতিমধ্যে লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, বায়নানামায় অগ্রিম হিসেবে ২ কোটি টাকা দেখানো হলেও প্রকৃত লেনদেনের পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি।
এর আগে জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের পরিদর্শনসংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাতে জানা যায়, ইসলামী ব্যাংকের আসকারদিঘী পাড় শাখায় মাত্র ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে খোলা একটি হিসাবে এক বছরের কম সময়ে প্রায় ১৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। জমি বিক্রির অগ্রিম অর্থও ওই হিসাবে লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
হিসাবটির নাম CHATTOGRAM METROPOLITON SANGBADIK SOMOBAY SOMITI LIMITED। হিসাব নম্বর ২০৫০৪৭০০২০০১২৩৩০৮। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সমিতির নামে একই নাম ব্যবহার করে এই হিসাব খোলা হয়েছে। অথচ সমিতির মূল ব্যাংক হিসাব রয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব শাখায়। সমবায় অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে মূল হিসাবে জমি বিক্রির অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, বায়নানামায় উল্লেখ করা মূল্য এবং জমির প্রকৃত বিক্রয়মূল্য নিয়ে ওঠা অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সমিতির সদস্যদের একাংশ।
অনুমোদন ছাড়াই জমি বিক্রির অভিযোগ
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় গত ২১ সেপ্টেম্বর জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়ে চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, সমিতির সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন।
মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের প্রশাসন শাখা-২-এর পরিপত্র অনুযায়ী, এ ধরনের জমি হস্তান্তরের অনুমোদন যাচাইয়ের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা সমবায় কর্মকর্তা ওই কমিটির একজন সদস্য। কিন্তু সংশ্লিষ্ট জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের অনুমোদন চেয়ে ওই কমিটির কাছে কোনো আবেদন জমা দেওয়া হয়নি বলে জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, জেলা সমবায় কর্মকর্তাকে অবহিত না করে এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই সমিতির বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি জমি বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। এভাবে জমি বিক্রি করা হলে সমিতির সদস্যদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে। একই সঙ্গে সিডিএ যে উদ্দেশ্যে জমি বরাদ্দ দিয়েছিল, তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চিঠিতে গত ৩ ফেব্রুয়ারি নিবন্ধিত ৬৪৮/২০২৬ নম্বর বায়নানামাকে আইনগত অনুমোদন ছাড়া সম্পাদিত বলে উল্লেখ করে এর কার্যকারিতা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া জমিটি বিক্রি বা হস্তান্তরের সুযোগ নেই। এ কারণে জমিটির নিবন্ধন বন্ধ রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সমবায় সমিতি আইন, ২০০১-এর ৪৮(২) ধারার আওতায় সমিতির কার্যক্রম পরিদর্শনের জন্য রাঙ্গুনিয়া উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা পার্থ কান্তি বিশ্বাসকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ও নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে জমি বিক্রির প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
জমি নিবন্ধন বন্ধে বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জমির তফসিল উল্লেখ করে বিক্রি ও হস্তান্তরের অনুমতি না দিতে সিডিএ চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একই বিষয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়েও চিঠি দেন সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন কর্মকর্তা। পরে সাবরেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার, নিবন্ধন মহাপরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরেও জমিটির নিবন্ধন বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
জেলা সমবায় কর্মকর্তার কার্যালয়ের বক্তব্য, প্রাথমিক পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য ও নথির ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অনুমোদনসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত জমির হস্তান্তর ও নিবন্ধন বন্ধ রাখা প্রয়োজন। অন্যথায় সমিতির সদস্যদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জমি বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।
এদিকে জমি বিক্রির বিষয়ে সমিতির একাধিক সদস্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। গতকাল রোববার আদালত জমি হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা দেন এবং সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিবাদীদের ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
তদন্তের দাবি সদস্যদের
সমিতির সদস্যদের একাংশ জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার কার্যবিবরণী, সাধারণ সভার অনুমোদন, বায়নানামার শর্ত এবং ব্যাংক হিসাবের লেনদেন প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, জমি বিক্রির উদ্যোগে কারা জড়িত, অর্থ কোথায় গেছে এবং কোনো সদস্য ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা তদন্ত করে দেখা হোক।
সদস্যদের ভাষ্য, আবাসন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ পাওয়া জমি বিক্রি হলে সমিতির দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে। এতে ফ্ল্যাট পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে এবং সদস্যদের মধ্যে কীভাবে বণ্টন করা হবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
