দেশে সৌরবিদ্যুতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ মাত্র সোয়া চার টাকার মধ্যে উৎপাদন করা সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলেই অন্তত ১৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। বিশেষ করে দেশের ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়, ১৫০টি কলেজ, রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও শৈলকূপায় ১৩২ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুতের সুযোগ রয়েছে— এমন চিত্র উঠে এসেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির একটি দলের গবেষণায়।
সেখানে বলা হয়েছে, বছরে ১৯ কোটি ২৭ লাখ ৪৭ হাজার ইউনিট এবং ২০ বছরে ১২০ গিগাওয়াট আওয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে করে বছরে ১ লাখ ১৯ হাজার ৫০২ টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ৩১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ছাদ ব্যবহার করে ৫২.৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার সুযোগ রয়েছে। ২৮৮ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা আসবে।
গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে সৌরবিদ্যুতের উন্নয়নবিষয়ক নাগরিক সংলাপে রিপোর্টটি তুলে ধরা হয়।
সরেজমিন পরিদর্শন করে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা এবং বিস্তারিত খরচ ও সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে রিপোর্টে। এতে বলা হয়েছে, কয়লা এবং তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় অনেক কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। এ বিদ্যুতের সবচেয়ে সুবিধা হচ্ছে, ধারাবাহিকভাবে একই দামে পাওয়া যাবে। সুযোগ রয়েছে দাম কমে যাওয়ারও। গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন প্রভাষক শিহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, যেসব সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে রয়েছে তার সর্বোচ্চ খরচ বিবেচনায় নিয়ে এ মূল্যকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ১৫০টি কলেজের ছাদ ব্যবহার করে ৫১.১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বছরে প্রায় ৭ কোটি ১৪ লাখ ইউনিটের ওপর উৎপাদন হবে। ২০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণসহ ইউনিটপ্রতি খরচ পড়বে ৪.১৫ টাকা।
অন্যদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনে ২৪.৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। ১৩৫.৫ কোটি টাকা বিনিয়োগে ২০ বছরে বিদ্যুতের দাম দাঁড়াবে ৫১৬ কোটি টাকা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ। তিনি বলেন, গবেষণার কাজটি খুবই সময়োপযোগী হয়েছে। আমরা একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি, সরকার সৌরবিদ্যুতের বিষয়ে খুবই আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন দিক থেকে যেসব প্রস্তাব এবং দাবি এসেছে সবগুলো বিবেচনায় নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেওয়াসহ সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আরও যদি কোনো বিষয় থেকে থাকে, তা সামনে আনলে অবশ্যই বিবেচনা করা হবে।
মার্চেন্ট বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ৭.৫০ টাকা নির্ধারণ প্রসঙ্গে সচিব বলেন, বিষয়টি এ মুহূর্তে খুবই যৌক্তিক হয়েছে। তবে যেহেতু অনেক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করছি, ডিউটি কমানো হচ্ছে, ভবিষ্যতে এর দাম কমে আসবে।
ক্যাবের জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, ছাদভিক্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ৪.৫০ টাকা বলা যায়। এই বিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, সূর্যের আলোর জন্য কোনো দাম দিতে হচ্ছে না। সে কারণে কোথায় যুদ্ধ হলো তাতে দামে হেরফের হবে না। সৌরবিদ্যুতে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমে আসবে। সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি আমাদের সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, এ মুহূর্তে স্টোরেজ নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। সঞ্চয় করে যদি রাখতেই হয় তাহলে ভোক্তা রাখবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্যাপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ করতে চায় সরকার, এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হবে। তাদের চেয়ারটেবিলের ধুলা পরিষ্কার করার লোকবল থাকে না। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করবে কে!
ওমেরা এলপিজির সিইও মাসুদুর রহিম বলেন, ছাদভিক্তিক সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এর রক্ষণাবেক্ষণ। স্থাপনা নিজের হলে এক রকম, আর অন্যের ভবনের ছাদে করলে দেখাশোনা করা কঠিন। বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার-ক্যাবল চুরি হয়ে যাচ্ছে, আরেকজনের স্থাপনায় আমার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র কীভাবে রক্ষা হবে? আরেকটি বিষয় হচ্ছে বিনিয়োগের নিশ্চয়তা, আমি যাকে বিদ্যুৎ দিচ্ছি তিনি যদি বিল না দেন, তাহলে আমার বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে।
অন্যান্য উদ্যোক্তাও বিনিয়োগের নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, বিনিয়োগ নিরাপদ করার ফর্মুলা বের করতে না পারলে সৌরবিদ্যুতের বেশি অগ্রগতি আশা করা কঠিন। সরকার অনেক ভালো ভালো উদ্যোগ নিচ্ছে, তবে এখানে তাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে।
অনুষ্ঠানে ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া সভাপতিত্ব করেন। সঞ্চালনা করেন ক্যাবের গবেষণা সমন্বয়ক শুভ কিবরিয়া।
