পাখি দেখা বা পাখি পর্যবেক্ষণের অভ্যাস মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। এমনকি বয়স বাড়ার সঙ্গে স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তির যে অবনতি ঘটে, তা ধীর করতেও সহায়ক হতে পারে এই অভ্যাস। নতুন গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের থেরাপি হিসেবেও ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে পাখি দেখা।
যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসের ফোর্জ মিল লেকে প্রতি সপ্তাহে একদল বয়স্ক মানুষ পাখি দেখতে জড়ো হন। তাদের অনেকেরই দিনের আগের ঘটনা মনে করতে বা কথোপকথন অনুসরণ করতে সমস্যা হয়। কিন্তু পাখি দেখার সময় তারা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। পাখির আচরণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন।
তাদের একজন ৭৮ বছর বয়সি হ্যারল্ড। একসময় প্রকৃতির প্রতি তার গভীর আগ্রহ থাকলেও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি অনেকটা গুটিয়ে যান এবং উদ্বিগ্ন থাকতেন। তার মেয়ে লুসি তাকে পাখি দেখার দলে নিয়ে আসেন। প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলেও পরে রবিন পাখি দেখে হাসতে শুরু করেন হ্যারল্ড। পানিতে হাঁসের খেলা দেখে আনন্দ পান। আশপাশের গাছে নীল রঙের ছোট পাখি উড়তে দেখে দীর্ঘদিন পর তাকে হাসতে দেখেন তার মেয়ে।
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা এজ ইউকের কর্মকর্তা জেনি বাডিঙ্গার বলেন, ওই মুহূর্তে হ্যারল্ড স্মৃতিশক্তি বা আত্মবিশ্বাস নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন না। তিনি বর্তমান মুহূর্তে আনন্দ উপভোগ করছিলেন। বিষয়টি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মস্তিষ্কের গঠনেও পরিবর্তন
যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পরিচর্যাকেন্দ্রে বয়স্ক মানুষ ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পাখি দেখার আয়োজন করা হচ্ছে। জানালার বাইরে পাখি দেখলেও বয়স্ক ব্যক্তিরা অন্যদের সঙ্গে সংযোগ অনুভব করতে পারেন, ইতিবাচক আবেগের অভিজ্ঞতা পান এবং স্মৃতিসংক্রান্ত দক্ষতায় উপকার পেতে পারেন।
কানাডার টরন্টোর বেক্রেস্ট একাডেমি ফর রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের স্নায়ুবিজ্ঞানী এরিক উইংয়ের নেতৃত্বে এক গবেষণায় দেখা হয়েছে, পাখি পর্যবেক্ষণের দক্ষতা মস্তিষ্কে কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
গবেষকেরা অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষক ও নতুনদের পাখি শনাক্ত করার দক্ষতা পরীক্ষা করেন। একই সঙ্গে তাদের মস্তিষ্কের এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, মনোযোগ, দৃশ্যগত উপলব্ধি ও দৃশ্য দেখে কোনো কিছু শনাক্ত করার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশগুলোতে অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের কার্যক্রম ভিন্ন।
বিশেষ করে অপরিচিত পাখি শনাক্ত করার সময় তাদের মস্তিষ্কের এসব অংশে বেশি সক্রিয়তা দেখা যায়। গবেষকেরা বলছেন, পাখি পর্যবেক্ষণের অভ্যাসের কারণে এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে, নাকি আগে থেকেই মস্তিষ্কের গঠনে পার্থক্য ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
তবে একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, পাখি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশগুলোতে ‘নিউরোপ্লাস্টিসিটি’ ঘটতে পারে। অর্থাৎ অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের প্রভাবে সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আসতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে সংগতি ও সুশৃঙ্খল সংযোগ কমতে থাকে। অভিজ্ঞ পাখি পর্যবেক্ষকদের মস্তিষ্কের কিছু অংশে একই বয়সি অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি সংগতি বজায় ছিল। এর মধ্যে এমন কিছু অংশও রয়েছে, যেগুলো পাখি শনাক্ত করার সময় বেশি সক্রিয় হয়।
গবেষক উইংয়ের মতে, এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে পাখি পর্যবেক্ষণের দক্ষতা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক সংগঠন ধরে রাখতে সহায়তা করে। তবে এই প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে এবং সামগ্রিক চিন্তাশক্তির সঙ্গে এর সম্পর্ক কী, তা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের জন্যও উপকারী
পাখি দেখার উপকার পেতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। পোল্যান্ডে ৩৮৮ জন পাখি পর্যবেক্ষকের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা পাখি দেখাকে নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন এবং এ বিষয়ে বেশি আগ্রহী, তারা মানসিক প্রশান্তি ও সতেজতা বেশি অনুভব করেন। শুধু দক্ষতা থাকলেই যে একই উপকার পাওয়া যাবে, তা নয়।
জার্মানির ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আইখস্ট্যাট-ইঙ্গোলস্টাডের অধ্যাপক এলিজাবেথ কালস পরিচর্যাকেন্দ্রে বসবাসকারী বয়স্কদের ওপর পাখি দেখার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তার দল ৬৫টি পরিচর্যাকেন্দ্রের বাইরে পাখির খাবার রাখার ব্যবস্থা করে। এমনভাবে এগুলো স্থাপন করা হয়, যাতে বাসিন্দারা ঘরের সাধারণ জায়গায় বসেই পাখি দেখতে পারেন। কয়েক সপ্তাহ পর তাদের স্মৃতিশক্তি, চলাফেরার সক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার বিভিন্ন দিক মূল্যায়ন করা হয়।
গবেষণায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। পাখি পর্যবেক্ষণে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা কথোপকথন অনুসরণ করতে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং আগে দেখা পাখি মনে রাখতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হন। তাদের সতর্কতা ও মনোযোগেও উন্নতি দেখা যায়।
অধ্যাপক কালস জানান, তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যেই স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের কিছু উন্নতি চোখে পড়ে। গবেষণার ফলের ভিত্তিতে জার্মানির বাভারিয়া অঞ্চলের ৪০০টির বেশি পরিচর্যাকেন্দ্রে পাখির খাবার রাখার ব্যবস্থা ও পাখি দেখার জায়গা তৈরিতে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
স্ট্রোকের পরও পাখি পর্যবেক্ষণের ব্যবহার
যুক্তরাষ্ট্রেও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য ‘বার্ড টেলস’ নামে একটি থেরাপি কর্মসূচি চালু রয়েছে। এতে পরিচর্যাকেন্দ্রে পাখির খাবার রাখার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি পাখির ডাক অনুকরণ করতে পারে এমন খেলনা পাখির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির সঙ্গে পরিচিত করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা জানান, এই কার্যক্রম তাদের চিন্তাশক্তি সক্রিয় রাখতে এবং অতীতের স্মৃতি মনে করতে সহায়তা করে।
স্ট্রোকের পর কথা বলা বা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্যও পাখি পর্যবেক্ষণের কর্মসূচি চালু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মন্টানার একটি কর্মসূচিতে ২০২১ সালে পেঁচা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর শুরু হয়। এখন সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখা ও তাদের ডাক শনাক্ত করার কার্যক্রমও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাখি পর্যবেক্ষণের উপকার শুধু পাখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ, মনোযোগ, আবেগ, সামাজিক যোগাযোগ এবং কোনো কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণের সম্মিলিত প্রভাব এতে কাজ করতে পারে। পাখির উপস্থিতি মানুষের মধ্যে কৌতূহল, আনন্দ ও অপেক্ষার অনুভূতি তৈরি করে।
যুক্তরাজ্যে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিচর্যাকারীদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, প্রকৃতিতে হাঁটার পর বাইরে সময় কাটানোর জনপ্রিয় কার্যক্রমগুলোর মধ্যে পাখি ও অন্যান্য বন্য প্রাণী দেখা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। যাতায়াত বা বাইরে যাওয়ার সমস্যা থাকলেও জানালা দিয়ে পাখি দেখা সম্ভব।
গবেষক উইংয়ের মতে, জীবনের মধ্যবয়স থেকে শুরু করে বয়স বাড়ার সময়ও নতুন কিছু জানার আগ্রহ ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কৌতূহল মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। এর সঙ্গে মস্তিষ্কের নরএপিনেফ্রিন ও ডোপামিনের মতো রাসায়নিকের কার্যক্রমের সম্পর্ক থাকতে পারে, যা মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।