Published on
:
4 min read
‘বলদে চড়িয়া শিবে শিঙ্গায় দিলা হাঁক,
আর শিঙ্গা শুনি মর্ত্যেতে বাজিয়া উঠল ঢাক।
শিবের সনে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী,
আশ্বিন মাসে বাপের বাড়ি আসেন ভগবতী।’
বাংলার প্রাণের ছোঁয়া লাগা এই লোকসঙ্গীতের সুরে ধরা পড়ে বাঙালি মননে গাঁথা দেবী দুর্গার ভরা সংসারের কাহিনি। একনিষ্ঠ স্বামী, চার পুত্র-কন্যা, সঙ্গে পশুপাখি। সংসারে দারিদ্র্য হয়তো আছে, কিন্তু প্রেম-প্রীতির অভাব নেই। রাজসুখ নয়, মেয়ের জন্য এমনই এক সংসারের প্রার্থনা করেন অতি সাধারণ স্বপ্নে জারিত বাংলার বাবা-মায়েরা। এই বাঙালি গ্লোবাল ভিলেজ জানে না, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হদিশ রাখে না। তাঁরা স্বয়ং অন্নপূর্ণাকে হাতের কাছে পেয়ে ‘সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে’র বেশি কিছু চাওয়ার কথা ভাবতে পারে না। তাই উমার সংসার যেন সব বাঙালি বাবা-মায়ের সন্তানের জন্য চাওয়া স্বপ্নের সংসার।
বাংলার দুর্গাপুজো মানেই সাধারণত দশভুজা সিংহবাহিনী, পায়ের কাছে মহিষাসুর, সঙ্গে এক পাশে লক্ষ্মী ও গণেশ এবং অন্য পাশে সরস্বতী ও কার্তিক। তবে এ রাজ্যেরই কোথাও কোথাও দেখা যায় দুর্গার এক অন্য পরিবারের ছবিও। যে সংসারে তাঁর পুত্র-কন্যা অনুপস্থিত, পরিবর্তে রয়েছে দুই সখী — জয়া ও বিজয়া। কারা এই জয়া-বিজয়া? দুর্গাপুজোয় কী স্থান তাঁদের?
কে জয়া ও বিজয়া?
কালিকা পুরাণ ও দেবী পুরাণ বলছে, মহাদেবের সঙ্গে বিয়ের পরে গিরিরাজ হিমালয় এবং মেনকার কন্যা পার্বতী যখন কৈলাস যাত্রা করেন, তখন তাঁর সঙ্গে অষ্টসখী, অর্থাৎ অর্থাৎ আট বান্ধবীকেও পাঠানো হয়। প্রাচীনকালে স্বচ্ছল গৃহস্থ ঘরের মেয়েদের বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে একা পাঠানো হতো না। সঙ্গে যেতেন দাসী ও প্রিয় সখীরা। সেই প্রতিচ্ছবিই ধরা পড়েছে দুর্গার সঙ্গে তাঁর অষ্টসখীর কৈলাস যাত্রার উপাখ্যানে। এই আট জন সখীর মধ্যে দুর্গার সবচেয়ে প্রিয় দুই সখী হলেন জয়া ও বিজয়া।
বাড়ির পুজোয় জয়া-বিজয়ার স্থান
শিব পুরাণেও জয়া ও বিজয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। মর্ত্যে উমার আগমনকালেও তাঁর সঙ্গে দুই প্রিয় সখীর সহাবস্থান অত্যন্ত স্বাভাবিক। বর্ধমানের গুসকরায় মাঝি বাড়ির পুজোয় মা দুর্গার সঙ্গে তাঁর দুই পাশে জয়া ও বিজয়াকে দেখা যায়। সেখানে অনুপস্থিত তাঁর চার সন্তান। মাঝি বাড়ির অন্যতম সদস্য অপল মাঝি এই সময় অনলাইনকে জানিয়েছেন, মোটামুটি ৩০০ বছর আগে তাঁরা ওডিশা থেকে বাংলায় আসেন। ওডিশা থেকেই দুর্গার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক গণেশের বদলে জয়া ও বিজয়ার পুজোর রীতি বাংলায় নিয়ে আসেন তাঁরা।
ওডিশায় জয়া-বিজয়া পুজোর রীতি
ওডিশায় দেবী দুর্গার সঙ্গে তাঁর দুই সখী জয়া-বিজয়ার মূর্তি বেশ প্রচলিত। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের বিমলা মন্দিরেও দেবী দুর্গার দু’পাশে জয়া ও বিজয়াকে দেখা যায়। জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে অবস্থিত বিমলা মন্দির আসলে একটি শক্তি পীঠ। মনে করা হয়, বিমলা দেবীর মন্দির খোদ শ্রীমন্দিরের থেকেও প্রাচীন। দেবী পুরাণ অনুসারে, এখানে সতীর পা পড়েছিল। জগন্নাথ দেবের প্রসাদ বিমলা দেবীকে নিবেদন করার পরেই তা মহাপ্রসাদ হিসেবে গণ্য হয়। এই বিমলা মন্দিরে পার্বতীর দুই পাশে স্থান পেয়েছেন তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়া।
শাস্ত্রে জয়া-বিজয়া পুজোর রীতি
জ্যোতিষ সম্রাট দেবজ্যোতি মজুমদারের মতে, শাস্ত্রমতে জয়া-বিজয়ার পুজো ছাড়া দেবীর আরাধনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠার সময় জয়া ও বিজয়ার প্রাণ প্রতিষ্ঠার উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাণ প্রতিষ্ঠার মন্ত্রে ‘ওম জং জয়া ঐ নমঃ’ এবং ‘ওম বিং বিজয়া ঐ নমঃ’ মন্ত্রে স্পষ্ট ভাবে জয়া ও বিজয়ার উল্লেখ রয়েছে। দুর্গাপুজোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জয়া-বিজয়ার পুজোর বর্ণনা আছে বলে জানাচ্ছেন দেবজ্যোতি। দুর্গাপুজো ছাড়াও অন্নপূর্ণা পুজো এবং জগদ্ধাত্রী পুজোয় জয়া-বিজয়ার আরাধনা হয়ে থাকে। মূল পুজোর পরে পঞ্চপচার অর্থাৎ গন্ধ, পুষ্প, ধুপ, দ্বীপ এবং নৈবেদ্য দিয়ে তাঁদের পূজা বিধি রয়েছে।
বারোয়ারি পুজোয় থাকেন জয়া-বিজয়া?
এখন প্রশ্ন হলো, শাস্ত্রমতে এত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কেন বারোয়ারি পুজোয় জয়া-বিজয়ার উপস্থিতি চোখে পড়ে না। গবেষক তমোঘ্ন নস্করের কথায়, ‘এ রাজ্যে দেবী আসেন ঘরের মেয়ে হয়ে। তাঁকে পরিবারের সঙ্গে ভরা সংসার নিয়ে দেখতেই ভালোবাসেন বঙ্গবাসী। তাই কোনও কোনও বনেদি বাড়ির পুজোয় এখনও জয়া-বিজয়া থাকলেও বেশিরভাগ স্থানে তাঁদের দেখা যায় না।’ তবে বিগ্রহে জয়া-বিজয়া না থাকলেও পুজোর রীতি, আচার ও মন্ত্রে তাঁরা থাকেন। অনেক জায়গায় দুর্গার চালচিত্রে জয়া-বিজয়ার উপস্থিতি ধরা পড়ে। তাই বলা যেতে পারে, দেবীর দুই প্রিয় সখী বারোয়ারি পুজোয় বিগ্রহ রূপে না থাকলেও পুরোপুরি হারিয়ে যাননি কখনওই।
দেবী ছিন্নমস্তার দুই সখী
দশমহাবিদ্যার অন্যতম হলেন দেবী ছিন্নমস্তা। নগ্নিকা এই দেবীর গলায় মুণ্ডমালা। এক হাতে উদ্যত খড়্গ, অন্য হাতে নিজের কাটা মুণ্ড। দেবীর ছিন্ন কবন্ধ (শরীর) থেকে রক্তের তিনটি ধারা প্রবাহিত হয়। একটি ধারা দেবী নিজে পান করেন এবং অপর দু’টি ধারা তাঁর দুই সহচরী ডাকিনী ও বর্ণিনী পান করেন। এই ডাকিনী ও বর্ণীনি আসলে জয়া ও বিজয়া। ছিন্নমস্তার সঙ্গে তাঁদের ডাকিনী ও বর্ণীনি নামে অভিহিত করা হয়েছে। জয়া অর্থাৎ ডাকিনী রজঃগুণের প্রতীক এবং বিজয়া অর্থাৎ বর্ণিনী তমঃগুণের প্রতীক। দেবী ছিন্নমস্তা স্বয়ং সত্ত্বগুণের প্রতীক। অর্থাৎ, ত্রিগুণা স্বরুপিনী দেবী সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের প্রতীকরূপে প্রকাশিত হন। সেই কারণে শক্তি বিগ্রহের দুই পাশে জয়া এবং বিজয়ার অবস্থান।
দেবী ছিন্নমস্তাছবি: রুশিতা বোস দত্ত
তন্ত্রমতে জয়া-বিজয়া
তন্ত্রশাস্ত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য তত্ত্ব হলো মৎস্য সাধন। ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না — এই তিন নাড়ি আমাদের দেহের মধ্যে মূলাধার থেকে সহস্রার পর্যন্ত বিস্তৃত। দেবজ্যোতি জানাচ্ছেন, তন্ত্রমতে এখানে ইরা হলো জয়া, পিঙ্গলা হলো বিজয়া এবং সুষুম্না আদি শক্তি। সুষুম্নাকে ঘিরে ইরা ও পিঙ্গলা সহস্রারে গিয়ে মিলিত হলে সাধক ব্রম্ভজ্ঞান লাভ করেন। সেই কারণে জয়া ও বিজয়া অর্থাৎ ডাকিনী এবং বর্ণীনি দেবী পুজোর এক অপরিহার্য অঙ্গ। তাঁদের বাদ দিয়ে সাধকের তপস্যা অপূর্ণ থাকে। জয়া-বিজয়াই সাধককে দেবীর দর্শন এবং ইষ্টলাভ বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করতে সাহায্য করে।
শাস্ত্রমতে আদি শক্তির সঙ্গে তাঁর দুই সহচরী, জয়া ও বিজয়ার উপস্থিতি ও উপাসনা অপরিহার্য। তবে বারোয়ারি পুজোয় তাঁরা মন্ত্র ও বিধির আবরণে ঢাকা পড়েছেন। বারোয়ারির চাকচিক্য তাঁদের বিস্মৃতির আড়ালে ঠেলে দিয়েছে। তবু জয়া আর বিজয়া আজও নীরবে অবস্থান করেন তন্ত্রের গূঢ় শাস্ত্রে এবং বাংলার প্রাচীন কয়েকটি বনেদি বাড়ির পুজোর নিভৃত মণ্ডপে — দেবীর একান্ত সখীর মর্যাদায়।