জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসনসংকট, শিক্ষার খরচ এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষের জেরে ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইতালি ও বেলজিয়ামে বিক্ষোভ হয়েছে। স্থানীয় সময় গত শনিবার এসব দেশের বিভিন্ন শহরে আয়োজিত পৃথক বিক্ষোভের কয়েকটিতে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। তবে দেশ ভেদে আন্দোলনের কারণ ও দাবিতে পার্থক্য ছিল।
ফ্রান্সে বিক্ষোভের ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি ছিল। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠন সিজিটি অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ বলে দাবি করেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা, শিক্ষকসংকট, সরকারি পরিষেবায় ঘাটতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ থেকে ফ্রান্সে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে আরও বিস্তৃত হয়। বহু মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে মিছিলে অংশ নিলেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের একাংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।
প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরে সিটি হল ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মার্সেইয়ে সিটি হলে ভাঙচুর এবং লিয়োঁতে শহরের পর্যটন দপ্তরে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার কথা বলেছেন। একইসঙ্গে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবির বৈধতা এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে দেখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
পর্তুগালে আবাসনসংকট ও কম মজুরি নিয়ে প্রতিবাদ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে গত শনিবার কয়েক দশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন বলে আয়োজক শ্রমিক সংগঠন সিজিটিপি জানিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব ছিল প্রতিবাদের প্রধান বিষয়। পুলিশ অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সম্পর্কে কোনো হিসাব দেয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের পর থেকে পর্তুগালে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন ভাড়াচুক্তির ক্ষেত্রেও ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আবাসন ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়ায় দেশটির বড় শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ছে।
বেলজিয়ামে শিক্ষাব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে কয়েক’শ মানুষ, যাদের অধিকাংশই তরুণ, বিক্ষোভে অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষাকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে—এমন সংস্কারের বিরোধিতা করেছে। বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। দেশটির লিয়েজ শহরেও বিক্ষোভ হয়েছে।
ইতালিতে বিক্ষোভ থেকে সংঘর্ষ
ইতালির মিলানে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদে মিছিল বের হয়। শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু নিক্ষেপ করে এবং ব্যারিকেডে আগুন দেয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইতালির সংবাদ সংস্থা লাপ্রেসের বরাতে বলা হয়েছে, মিলানে অন্তত দুই পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন এবং প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। বোলোনিয়াতেও বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
একই সময়ে বিক্ষোভ, তবে একক আন্দোলন নয়
চার দেশের বিক্ষোভে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো কিছু অভিন্ন উদ্বেগ দেখা গেলেও এগুলো একই নেতৃত্বে পরিচালিত কোনো একক ইউরোপব্যাপী আন্দোলন ছিল না। ফ্রান্সে সরকারি পরিষেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি পর্তুগালে আবাসনসংকট এবং বেলজিয়ামে শিক্ষাব্যয় ছিল বিশেষ গুরুত্বের বিষয়। ইতালিতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদের সঙ্গে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানও যুক্ত ছিল।
ইউরোপের কয়েকটি দেশে এসব বিক্ষোভ সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারি নীতির প্রতি অসন্তোষের চিত্র তুলে ধরেছে। তবে দেশভেদে পরিস্থিতি ও দাবির পার্থক্য থাকায় এসব ঘটনাকে পুরো ইউরোপে একই ধরনের আন্দোলন বা অভিন্ন অর্থনৈতিক সংকটের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো এবং শিক্ষা ও জনসেবার মান নিয়ে মানুষের উদ্বেগের সমাধান খোঁজা সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা এবং ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
