চলতি বছরের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে তীব্র দাবদাহে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা। দাবদাহজনিত মৃত্যুর হিসাবে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এসব মৃত্যুর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩২ হাজার ৬০০টির বেশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
গবেষণা সাময়িকী নেচার হেলথে প্রকাশিত সহকর্মীদের পর্যালোচনায় উত্তীর্ণ দুটি গবেষণা নিবন্ধে এসব তথ্য উঠে এসেছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক এবং গবেষণার অন্যতম লেখক ক্লেয়ার বার্নস বলেন, দাবদাহজনিত মৃত্যুর হিসাবে ২০২৬ সালের গ্রীষ্ম ইউরোপের অর্ধেকেরও বেশি এলাকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল।
জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে আন্তর্জাতিক নেতাদের তুরস্কে সমবেত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে এ তথ্য সামনে এল। এর কয়েক দিন আগে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার সুযোগ বিশ্বের সামনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
ক্লেয়ার বার্নস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ঠেকানোর পথ থেকে বিশ্ব অনেকটাই সরে গেছে। সরকারগুলোকে বুঝতে হবে, দ্রুত পদক্ষেপ ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ ইউরোপে চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের মধ্যে দাবদাহ এখন অন্যতম প্রাণঘাতী বিপদ। চলতি বছরের মে মাসের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত নজিরবিহীন উচ্চ তাপমাত্রায় পুরো মহাদেশ কার্যত ঝলসে গেছে।
এটি পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রীষ্মকাল ছিল। এ সময় তাপমাত্রা ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দেশে নির্দিষ্ট দিনে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়।
গ্রীষ্মে দাবদাহে প্রাণহানির হিসাব করতে বিজ্ঞানীরা ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরের তাপমাত্রার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে সম্ভাব্য তাপমাত্রার তুলনা করেন। এরপর জুনের শুরু থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত দাবদাহজনিত মৃত্যুর সংখ্যা নির্ণয়ে উচ্চ তাপমাত্রা ও দৈনিক মৃত্যুর সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে তৈরি গবেষণাভিত্তিক মডেল ব্যবহার করেন। গবেষকদের দাবি, এ পদ্ধতিতে পাওয়া আনুমানিক মৃত্যুর সংখ্যা বিভিন্ন দেশের জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত পরিসংখ্যানের কাছাকাছি থাকে।
এই বিশ্লেষণে দাবদাহজনিত মৃত্যুর আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৩৯১। গবেষকদের মতে, গত ২৬ বছরের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ প্রাণহানি। ২০২২ ও ২০০৩ সালে ইউরোপে আঘাত হানা বড় দাবদাহের চেয়েও এ সংখ্যা বেশি।
দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুক্তরাজ্যসহ তুলনামূলক শীতল উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোতেও হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা। তবে ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী অন্তত ৮০০ জনের মৃত্যুর সঙ্গে দাবদাহের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা বলছেন, দাবদাহজনিত মৃত্যুর পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে দাবদাহে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারজনিত দূষণ দায়ী ছিল। বর্তমানে এ হার বেড়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে দাঁড়িয়েছে।
গবেষণায় সরাসরি যুক্ত না থাকা ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাকেল নুনেস বলেন, দাবদাহ কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, গবেষণার ফল তার প্রমাণ। এর প্রভাব সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না বলে দাবদাহকে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
নুনেস আরো বলেন, কম বয়সীদের মৃত্যু বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। ৬৫ বছরের কম বয়সী হাজার হাজার মানুষেরও দাবদাহে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ক্লেয়ার বার্নস সতর্ক করে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত বিশ্বকে একের পর এক তীব্র ও বিপজ্জনক গ্রীষ্মের মুখোমুখি হতে হবে। ভবিষ্যতে আরো প্রাণঘাতী গ্রীষ্মের আশঙ্কাও রয়েছে। সূত্র: সিএনএন
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬
