আধুনিক এই যান্ত্রিক যুগে আমরা সবাই ছুটে চলেছি, কেউ সাফল্যের পেছনে, কেউবা সুখের সোনার হরিণের সন্ধানে। আমরা অনেকেই মনে করি, ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকার পাহাড় জমলে, আলিশান বাড়ি কিংবা ক্ষমতার ছড়ি ঘোরাতে পারলে বুঝি জীবনের সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে। অথচ একটু থেমে নিজের মনের আয়নায় তাকিয়ে দেখুন তো! পার্থিব সব আয়োজন ও প্রাচুর্য থাকার পরেও আমাদের কজন মানুষ সত্যি বলতে পারি যে, আমাদের অন্তরে এক বিন্দুও হাহাকার বা অশান্তি নেই?
প্রকৃতপক্ষে, বাহ্যিক চাকচিক্য আর মনের ভেতরের প্রকৃত প্রশান্তি সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। ধন-সম্পদ কেবল শরীরের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু আত্মার খোরাক জোগাতে পারে না। আত্মার এই তৃষ্ণা ও অন্তরের জমিনে শান্তির বারিধারা কেবল একাই ঢালতে পারেন সমস্ত শান্তির উৎস মহান আল্লাহ তাআলা।
শান্তির প্রকৃত উৎস কোথায়?
একজন মুমিন হিসেবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস-সব ধরনের শান্তি, স্বস্তি, নিরাপত্তাও আত্মিক স্থিরতার একমাত্র উৎস মহান আল্লাহ তাআলা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন…
‘জেনে রেখো, কেবল আল্লাহর জিকির ও স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮)
তাই জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে, মানসিক অস্থিরতা কিংবা দুশ্চিন্তার সময় রবের শরণাপন্ন হওয়া, তার ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখা এবং তার রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়াই একজন মুমিনের প্রধান সম্বল।
শান্তিময় জীবন পেতে বরকতময় দোয়া
হাদিস শরিফে জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত সুন্দর ও বরকতময় দোয়া শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। অন্তরে স্থিরতা আনতে এবং জীবনে সার্বিক শান্তি কামনায় আমরা নিয়মিত এই দোয়াটি পাঠ করতে পারি:
বাংলা উচ্চারণ…
আল্লাহুম্মা আন্তাস-সালামু ওয়া মিনকাস-সালামু, হাইয়্যিনা রাব্বানা বিস-সালাম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনিই তো ‘সালাম’ (সকল শান্তির মূল ও উৎস); আর শান্তি তো কেবল আপনারই পক্ষ থেকে বর্ষিত হয়। সুতরাং হে আমাদের রব! আমাদের সুখ ও শান্তিতে জীবিত রাখুন। (সূত্র: মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১৫৯৯৯)
নিয়মিত দোয়াটি পাঠের সুফল ও নিয়ম
নামাজের পর: প্রত্যেক ফরজ নামাজের সালাম ফেরানোর পরপরই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নাহসম্মত।
মানসিক অস্থিরতায়: দিনের কর্মব্যস্ততা, মানসিক চাপ কিংবা দুশ্চিন্তার মুহূর্তে নিজেকে শান্ত করতে নিয়মিত এ দোয়ার জিকির করা যায়।
পরিবারে শান্তির জন্য: ঘরে প্রবেশ করে বা পরিবারের কল্যাণ কামনায় এ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে শান্তি প্রার্থনা করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
প্রশান্তিময় জীবনের জন্য অতিরিক্ত ৩টি আমল
দোয়া পাঠের পাশাপাশি জীবনে প্রকৃত শান্তি পেতে নিচের ইসলামি অভ্যাসগুলো গড়ে তোলা প্রয়োজন…
১. তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা: যেকোনো প্রাপ্তি বা অপ্রাপ্তিতে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা): পাপের কারণে মানুষের মনে অশান্তি তৈরি হয়। নিয়মিত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করলে অন্তর হালকা হয়।
৩. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ (শুকরিয়া): অল্পতে সন্তুষ্ট থেকে আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে আল্লাহ জীবনে বরকত ও শান্তি বাড়িয়ে দেন।
প্রশান্তির চাবিকাঠি আমাদেরই হাতে
জীবন মানেই তো প্রতিনিয়ত যুদ্ধ, চড়াই-উতরাই আর নানা অপ্রত্যাশিত ধাক্কা। এই পথচলায় মন খারাপ হওয়া বা হাঁপিয়ে ওঠা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু মুমিনের বিশেষত্ব হলো, সে ঝড়-ঝাপটায় ভেঙে পড়ে না; বরং সে জানে কীভাবে শান্তিময় জীবনের মালিকের দরজায় কড়া নাড়তে হয়।
প্রতিদিনের ব্যস্ততার ভিড়ে জবানকে যখন আমরা এই বরকতময় দোয়ায় সিক্ত করব, তখন আমাদের চারপাশের কোলাহল ভেদ করে আল্লাহর রহমতের এক স্নিগ্ধ বাতাস আমাদের অন্তর জুড়িয়ে দেবে। আসুন, পার্থিব প্রাপ্তির অন্ধ দৌড় থেকে একটু সময় বের করে নিজের রবের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করি। পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা আমাদের সবার অশান্ত মনকে তার ইবাদত ও স্মরণে চিরতরে প্রশান্ত করে দিন। আমিন।
