লিমা অঘোরে ঘুমুচ্ছে।
অনেকক্ষণ তারও ঘুম আসেনি। এ পাশ-ও পাশ করেছে। ইচ্ছে করেই আমার বুকের ওপরে হাত রেখেছে, তাতে হয়নি, একটু পরে তার মাথা রেখেছে, কান পেতে শুনেছে বুকের বাদ্য, তার পর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। না না ভুল হলো। আজ সে ছিল প্রবল সক্রিয়। আমাকে জাগিয়ে তোলার সে কী প্রাণান্ত প্রচেষ্টা! কী যে প্রগলভতা! তার এলোমেলো আতালিপাতালি কথার কোনো মাথামুণ্ডু নেই। সেই সব সাতরঙা কথায় যথাযথ সাড়া না পেলে তার মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। একা-একাই অভিমান করে, গাল ফোলায়, চোখ মোছে, সহসা দুহাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে টকাস টকাস করে চুমু খায়, কিন্তু আমার ভেতরে কে যেন বাতি-নেভানো অন্ধকার ছড়িয়ে রাখে, সক্রিয় হতে পারিনি। অথচ লিমা আজ বিছানায় আসার আগে প্রিয় পারফিউম নিতে ভুল করেনি। এটা আমারও ভালো লাগা সুগন্ধি, সেটা খুব ভালোই জানে সে। সেই পারফিউম আজ একটুও ভালো লাগছে না। বরং বিরক্তিকর মনে হচ্ছে এই গন্ধ। আমার কি তবে ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের কোনো সমস্যা হয়েছে! লিমার তো কোনো দোষ নেই। সে যতই ঘনিষ্ঠ হয়, তার শরীরের এই গন্ধ ততই উৎকট হয়ে ওঠে। আমার কষ্ট হয়। নাকের কবাট বন্ধ করে শ্বাসনিয়ন্ত্রণ করে স্বস্তি খুঁজি। এসবের কিছুই টের পায় না লিমা। আমিও মুখ ফুটে কিছুই বলিনি। সে কী বুঝবে? আমি নিজেই কি জানি কেন এই গন্ধবিভ্রম আজ আমাকে পেয়ে বসেছে!
বুকের ওপর থেকে তার হাতটা নামিয়ে দিয়ে আমি পাশ ফিরে শুই। চোখ বুঁজে থাকি। কিন্তু ঘুম আসে না মোটেই। দেয়ালঘড়ির নির্ঘুম কাঁটা আমার চৈতন্যে পেরেক ঠুকে চলে নির্দয় হাতুড়িতে। আমি হাজার বছর ধরে পথ হাঁটি নিশীথের অন্ধকারে। অদূরেই ঘরের কোনে জোড়লাগা টিকটিকি আমাকে পরিহাস করে টিকটিক শীৎকারে। আমি নিরুপায় হয়ে চোখ বন্ধ করে রাখি।
তা চোখ বন্ধ থাকলেই কি দৃশ্যমানতার সব দুয়ারে পর্দা নেমে আসে! বরং বলা উচিত বিস্ময়কর এক অন্য জগৎ খুলে যায় চোখের পলকে। তখন আলো ঝলমলে পর্দা দুলে ওঠে। সেলুলয়েড ফিতায় গাঁথা ছবির পর ছবি ভেসে ওঠে দু-চোখের ওইটুকু ক্যানভাসে। মধ্যদুপুর নিয়ে আসে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা। শ্রাবণমেঘের আকাশও হয়ে ওঠে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত নিকানো উঠোন। পত্রহীন শাখায় শাখায় মুকুলিত হয় অগ্নিকুসুম। নইলে সহসা সেদিন লিফটের ঘেরাটোপ বাক্সের মধ্যে কাঠগোলাপের ঘ্রাণ আসবে কোত্থেকে! লিফটে তখন আর কেউ নেই। আমি আর রানু। রানু রায়। প্রথমে চিনতে পারিনি। না, চিনব কী করে! লিফটের ভেতরে দাঁড়িয়ে একজন ভদ্রমহিলার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকানো যায়! চোখে তার কালো সানগ্লাস। সে যে কোনদিকে তাকিয়ে ছিল কে জানে! লিফট ছেড়ে দেওয়ার মুহূর্তে ক্ষীপ্রগতিতে সে ঢুকে পড়ে। কিছুটা বিব্রত ছিল কি! ভেতরে একজনই সহযাত্রী। পুরুষ মানুষ। আবার সেই লোকটাই কি না হাত তুলে সেন্সরে প্রতিরোধ করে তাকে লিফটে উঠিয়ে নিয়েছে। ভাবনা তো একটু হতেই পারে! কিন্তু সেসব কথা ভাববার অবকাশ আমি পাইনি। আমার চেতনা তখন বিবশপ্রায় কাঠগোলাপের গন্ধে। আহা, কতকাল আমার নাসারন্ধ্র এই মোহ-মদির গন্ধের নাগাল পায়নি। ভেতরে ভেতরে এই গন্ধের জন্য এত যে আকুলতা জমেছিল তা তো কখনো টের পাইনি। রাজশাহী ছেড়ে আসার পর ঢাকা নগরীর কংক্রিটে আটকে পড়েছি দশ বছরেরও অধিক সময়। জীবন-জীবিকার শেকলে এমনই বন্দি সময়, বিয়ে করার মতো জরুরি কর্মটি সম্পাদনেও যথেষ্ট বিলম্ব হয়ে যায় এবং বয়ে বেড়াই নিষ্ফলা বন্ধ্যা জীবন। এই নগরীতে কাঠগোলাপের সন্ধান করব কখন!
লিফটের পাঁচ-এ এসে রানু রায় নেমে যায়। তার প্রয়োজন এই ফ্লোরে। বেশ কয়েকটি অফিস আছে এখানে। এর মধ্যে কোনটিতে তার কী প্রয়োজন, এসবের কিছুই জানি না আমি। লিফটের সহযাত্রী এই ভদ্রমহিলাই যে আমাদের মতিহার ক্যাম্পাসের রানু রায়, সেটাই তো তখনো আবিষ্কৃত হয়নি। এত কথা জানব কী করে! আমি যাব লিফটের সাত-এ। সেখানে আমার করপোরেট অফিস। প্রতিদিনের যাওয়া-আসা। সারা দিনে বেশ কয়েকবার লিফটে ওঠা-নামা করতে হয়। ইচ্ছে অথবা অনিচ্ছেয় কত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, দেখা হয়ে যায়। ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি অথবা হাই-হ্যালো পর্যন্ত বিনিময়েই পেরিয়ে যায় সামান্য সময়টুকু। এর মধ্যে কারও বা গায়ের ঘামের গন্ধ কারও বা কড়া পারফিউমের গন্ধ কখনো-সখনো নাকে এসে লেগেছে। কিন্তু এমন তো কখনো হয়নি, এই যে এই ঘ্রাণবিপর্যয়! বিপর্যয়ই তো! পাঁচ নম্বর থেকে লিফট ছেড়ে দিতেই সেই কাঠগোলাপের সৌরভ হারিয়ে যায়। নাকের পাতা কাঁপিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়েও আমি আর সুরভি কিছুতেই পাই না। পাই না বলেই মস্তিষ্কের নিউরন সহসা ক্লিক করে, একমুখ আলো ছড়িয়ে হেসে ওঠে ফেলে আসা কাঠগোলাপ।
রাজশাহীতে সাগরপাড়ার বাড়ির উঠোনে ছিল ঝাঁকড়ামাথা কাঠগোলাপের গাছ। সেই গাছ থেকে প্রতিদিন ফুল নিয়ে এসে রানু রায় বন্ধুদের হাতের মুঠোয় বিলিয়ে দিত। আমরা বেশ কজন একদিন দলবেঁধে ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম সেই কাঠগোলাপের গাছ দেখতে। রানুর মা, মানে আমাদের মাসিমা খুব হেসেছিলেন আমাদের পাগলামি দেখে। খুব আদর করে অনেক কিছু খাইয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিল মাসিমার হাতে বানানো নারকেল নাড়ু। সহসা আমার সব মনে পড়ে যায় পাঁচ নম্বর থেকে লিফট ছেড়ে দিতেই। খুব আফসোস হয়, একটু আগে কেন মনে পড়ল না রানুকে! ঊর্ধ্বমুখে চলন্ত লিফট থেকে হুট করে পাঁচ নম্বরে ফিরে আসার কোনো উপায় তো নেই। অগত্যা আমাকে সাত নম্বর পর্যন্ত যেতেই হয়। লিফট যাবে আরও ওপরে, ১০ নম্বর পর্যন্ত। সাত নম্বর ফ্লোরে নেমে আমার অফিসে না ঢুকে আমি দ্রুতপায়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নামি। পাঁচ নম্বরে এসে পাগলের মতো এ অফিস-সে অফিস ঢুঁ মারি, কোথাও যদি চোখে পড়ে যায় আবারও তাকে! আহা, দেখা না হোক, কাঠগোলাপের সেই মিঠেকড়া ঘ্রাণও কি পাব না! আমাদের মতিহার ক্যাম্পাসে যে পথে সে হেঁটে যেত, সেই পথেই ছড়িয়ে থাকত কাঠগোলাপের সৌরভ। কতদিন সেই সুরভিসূত্র ধরেই রানুকে খুঁজে পেয়েছি। বুকের ভেতরে হাহাকার গুমরে ওঠে–আজ আর কিছুতেই পাব না তাকে!
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একেবারে শেষ পর্বে এসে একদিন জানা গেল বৈবাহিক সূত্রে রানু রায় কলকাতা নাকি ব্যাঙ্গালোর কোথায় নাকি চলে গেছে। আমরা তো ভয়ানক অবাক, তাহলে পরীক্ষার কী হবে! এখনো বাকি আছে এক পেপার। তার পর আছে ভাইভা। তার রেজাল্ট তো কিছুতেই খারাপ হওয়ার কথা নয়। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কবিতা আবৃত্তি কিংবা নাটক থিয়েটার যা-ই করুক না কেন, লেখাপড়ায় সে কখনো পিছিয়ে থাকেনি। সেই মানুষের মাস্টার্সটাই হবে না! বিয়েটাই তার সবকিছু ওলোট-পালোট করে দিল! আমাদের বেশ কজন বন্ধুর খুব মন খারাপ হয়ে যায়। একমাত্র আমিই তাকে গোপনে গোপনে রানু সোম নামে ডাকতাম। কে রানু সোম সেই ব্যাখ্যাও দিয়েছি তাকে। কাজী নজরুল গান শিখিয়েছেন তাকে। বাটার মোড়ে গানের স্কুলে গিয়ে ওস্তাদ হরিশংকর দাসের কাছে আমিও যে নজরুলগীতি শিখতাম, সে খবর জানা ছিল রানু রায়ের। একদিন দুম করে আমাকে সে প্রশ্ন করেই বসে–তুমিও কি নজরুলের মতো করে আমাকে গান শেখাতে চাও অনীক? প্রশ্ন করে বটে, উত্তর শোনার কোনো গা নেই তার, হি-হি করে হাসিতে লুটিয়ে পড়ে আর কাঠগোলাপের ঘ্রাণ ছড়ায়।
সেই আমাদের রানু রায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার পর রাজশাহীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অনেকটাই খসে পড়ে। তবে রাজশাহী শহরের বন্ধু সুলতানের কাছে একদা শুনেছিলাম, সাগরপাড়ার সেই কাঠগোলাপঅলা বাড়িটা বিক্রি করে দিয়ে রানুর বাবা-মাও ইন্ডিয়ায় চলে গেছে। সত্যি-মিথ্যে যাচাই করার সুযোগও হয়নি, প্রয়োজনও হয়নি। সেই রানু রায় ঢাকায়! বড় কুহকিনী এই নগরী। কতজনকে কতভাবেই না ঢেকে রেখেছে মায়ার আঁচলে! তাই বলে আমাদের রানুকেও!
কী জানি কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে কি না, আমি ঠিক ধরতে পারি না। আমার দিকে সে একবারও তাকায়নি লিফটের ভেতরে! আমাকে চেনাই গেল না! আমার কি মাথায় জট নেমেছে? হ্যাঁ, গোঁফ-দাড়ির কারণে সামান্য একটু আড়াল হয়েছে হয়তো। ছাত্রজীবনে ক্লিন শেভ করতাম, এখনকার ফ্যাশন হয়েছে দাড়ি রাখা। বিয়ের
সময় সেই দাড়ি কেটে ফেলার কথাও ভেবেছিলাম, কিন্তু লিমা সেটা সমর্থন করেনি। তাই কেটেছেঁটে মুঘল সম্রাটদের মতো এই গোঁফ-দাড়ি রাখা। তাতেই অচেনা হয়ে গেল! মানুষকে তো দেখতে হয় তার চোখের আয়নার ছবি দিয়ে। কোথায় মুঘল সম্রাট, আর কোথায় আমি এক কাঙাল হরিদাস পাল!
সারাটা দিন অফিসে নিজের চেয়ারে থিতু হয়ে বসতে পারি না আমি। কী যে কণ্টকিত খচখচানি!
মনে হয় যেন এবার গেলে লিফটের মুখেই আমি দেখতে পাব আমাদের রানু রায়কে। তার আঁচলে না থাকুক রাশি রাশি কাঠগোলাপ, তবু সে হাসলেই কাঠগোলাপের সৌরভ হেসে উঠবে। আজ আর এই অবেলায় আমি কী চাই তার কাছে, কীসের প্রত্যাশা! নিজেকে প্রশ্ন করি, আবার নিজেই উত্তর খুঁজি। খুঁজে খুঁজে হয়রান! নাহ, সারা দিনে সেই সৌরভের কোনো নাগাল পাইনি।
দিনশেষে বাসায় ফিরে লিমার চোখে চোখ রেখে কী এক অচেনা তৃষ্ণা নিয়ে তাকাই। দুহাতে তার মুখ উঁচু করে তার পানপাতা মুখটাকে আয়নার মতো ধরে রাখি। লিমা কোনো প্রতিবাদ করে না, বরং তার স্বামীর আচরণে কী এক নতুন মাত্রা খুঁজে পায়, আবেগ থরোথরো দুহাতে প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে স্বামীকে, বেঁধে রাখতে চায় অদেখা সুতোর গিটে। রাতের বিছানায় সে এই মানুষটিকে খুঁজবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু আমি নিজেই তো আমাকে খুঁজে পাচ্ছি না। মধ্যরাত পেরিয়ে যাওয়ার পর ঘুমন্ত লিমাকে বিছানায় রেখে আমি পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে আসি বেলকনিতে। খুবই ছোট্ট অপ্রশস্ত জায়গা। তবু কত না যত্ন করে মাটির টবে দু-ঝাড় বেলি ফুলের গাছ লাগিয়েছে। সাধ্য মতো যত্ন করে। পানি দেয়, সারমাটি দেয়। সাদা ধবধবে ফুল ফুটেছে সেই গাছে। কী যে স্নিগ্ধ কমনীয় গন্ধ ছড়িয়েছে। টবের গাছে ফুল ফুটিয়ে লিমা খুবই আনন্দিত। কিন্তু কাঠগোলাপের ঘ্রাণে মোহাচ্ছন্ন আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়। ঘ্রাণেন্দ্রিয় একক আধিপত্য বিস্তার করেছে অন্য সব ইন্দ্রিয়ের ওপরে। আমার ভেতরের আমিকে লিমা জাগাবে কী করে! সারা গায়ে দামি ফরাসি পারফিউম মাখলেই কি কাঠগোলাপের ঘ্রাণকে অতিক্রম করা যায়!
