আজকাল ওয়েবডেস্ক: ময়মনসিংহের দুর্গাবাড়ী রোডে তখন সুরের তালে তালে লাল পাড় সাদা শাড়ির ভিড়, চলছে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই দৃশ্য দেখলে যে কারও মনে হতে পারে এটি কলকাতার বা পশ্চিমবঙ্গের কোনও চেনা শারদোৎসবের ছবি। কিন্তু এটি ছিল বাংলাদেশের ছবি, যেখানে বহু বছর পর এমন বাঁধভাঙা আনন্দ আর নির্ভীক স্বস্তির মুহূর্ত ধরা পড়ল। গত কয়েক বছরে আশঙ্কার যে কালো মেঘ এ দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুজো পার্বণকে তাড়া করে ফিরছিল, এবার সেই চেনা উদ্বেগকে ছাপিয়ে অনেকটাই শান্ত ও নির্ঝঞ্ঝাটভাবে শেষ হল দুর্গোৎসব।
ক্ষমতায় আসার পর নিজেদের প্রথম দুর্গাপূজায় সার্বিক নিরাপত্তাকেই শীর্ষ অগ্রাধিকার দিয়েছিল তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। উৎসবের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বার্তা দিয়েছিলেন, ধর্ম যার যার হলেও রাষ্ট্র সবার এবং নিরাপত্তা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। সেই আশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখা গিয়েছে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপেও। দেশজুড়ে প্রায় ৩৩,৮৬১টি মণ্ডপের সুরক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছিল ৬ হাজারেরও বেশি বিশেষ নিরাপত্তা কর্মী, শত শত টহলদারি গাড়ি ও মোটরবাইক। শুধু রাজধানী ঢাকার ২৫৭টি মণ্ডপেই পাহারায় ছিল ২ হাজারেরও বেশি পুলিশ কর্মী। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে পুজো উদযাপন কমিটির নেতৃত্বও স্বীকার করেছেন, অতীতে যেখানে উৎসব মানেই ছিল এক অজানা আতঙ্ক, সেখানে এবার সরকারের নিরাপত্তা বলয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনে এক বিরল ভরসা জুগিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজে বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন, মন্ত্রী ও সাংসদদের নিজ নিজ এলাকায় নজরদারির সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
নিরাপত্তার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কিছু দাবি মেটাতেও সক্রিয় হয়েছে সরকার। পুজো উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়েছিল, যা সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে টানা পাঁচ দিনের অবকাশ তৈরি করে। আগামী বছরগুলোতেও এই তিন দিনের সরকারি ছুটি বজায় রাখার আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে উৎসবের আবহে বিশৃঙ্খলা তৈরির ছক যে একেবারেই ছিল না, তা নয়। গত ১৮ অক্টোবর গাজীপুরের কোনাবাড়ির শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ কেন্দ্রীয় মন্দিরে এক ব্যক্তি নিজের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে ঢুকে প্রতিমার সামনে ধর্মগ্রন্থ পুড়িয়ে প্ররোচনা তৈরির চেষ্টা চালায়। কিন্তু মন্দিরের রক্ষী ও সেখানে উপস্থিত পুলিশ বাহিনীর তৎপরতায় তৎক্ষণাৎ আগুন নিভিয়ে অভিযুক্তকে পাকড়াও করা হয়। ফলে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ফাঁদ মুহূর্তের মধ্যে ভেস্তে যায়।
এই স্বস্তির মধ্যেও অবশ্য অতীতের ক্ষত আর দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন পুরোপুরি মুছে যায়নি। ২০২১ সালের কুমিল্লা কাণ্ডের হিংসা, প্রতিমা ভাঙচুর কিংবা পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর ঘটে যাওয়া বিক্ষিপ্ত হামলার স্মৃতি আজও তাড়া করে বেড়ায় অনেককেই। সেই সব ঘটনার ন্যায়বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত। ফলে উৎসব নির্বিঘ্নে কাটলেও হিন্দু নেতৃত্বের মনের ভেতরের মূল আকাঙ্ক্ষাটি রয়েই গিয়েছে—তাঁরা চান এমন এক স্থায়ী স্বাভাবিক পরিবেশ, যেখানে কেবল কড়া পুলিশি পাহারায় নয়, বন্দুকের নল ছাড়াই নির্ভয়ে ও স্বাভাবিক নিয়মে ধর্ম পালন করা যাবে।
