অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের গুণগত মানের ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে প্রথাগত শিক্ষাদান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা-সব মিলিয়ে এই খাত এখন এক গভীর কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি। তবে কেবল সংকটের তালিকা দীর্ঘ না করে, মূল সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং তথ্যভিত্তিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর টেকসই নীতি নির্ধারণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রথাগত তাত্ত্বিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের স্বাস্থ্যশিক্ষাকে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তি-বান্ধব এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণানির্ভর হিসেবে রূপান্তর করার আর কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যশিক্ষায় দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা, বাস্তব প্রেক্ষাপট এবং প্রয়োজনীয় রূপান্তরের প্রধান দিকগুলো নিচে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা হলো-
এক. ক্লিনিক্যাল সিমুলেশন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহমর্মিতা: স্বাস্থ্যশিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে প্রথাগত তাত্ত্বিক পদ্ধতির বাইরে সিমুলেশন-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে (যেমন- অস্ট্রেলিয়া) সরাসরি রোগীদের ওপর প্রয়োগের পূর্বে ম্যানিকুইন বা কৃত্রিম প্রতিকৃতির মাধ্যমে চিকিৎসকদের দক্ষতা ‘হাতে-কলমে’ যাচাই করা হয়। জয়েন্ট ইনজেকশন প্রদানের মতো সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলোতে আগে সিমুলেশনের মাধ্যমে পরিপক্বতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করে তবেই রোগী-ব্যবস্থাপনার অনুমতি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ওই ‘কম্পিটেন্সি-বেসড ট্রেনিং’ বা যোগ্যতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের তাগিদ দেওয়া হলেও অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতায় তা এখনও পূর্ণতা পায়নি, যা অবিলম্বে কার্যকর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষক ও সহকর্মীদের পারস্পরিক একাডেমিক সহমর্মিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্নাতকোত্তর শিক্ষাজীবনে গবেষণার জটিল মুহূর্তে সহকর্মীদের পারস্পরিক সহায়তা ও সমন্বিত প্রচেষ্টা উচ্চশিক্ষার পথকে সুগম ও গতিশীল করতে অনন্য ভূমিকা পালন করে।
দুই. শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ঘাটতি ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি: উচ্চতর বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিতে প্রবেশ করা অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই মৌলিক জ্ঞান ও যোগাযোগের ভাষার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় ঘাটতি দেখা যায়। ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতার অভাব তো রয়েছেই, এমনকি বাংলায় ব্যাখ্যা করলেও অনেক সময় মূল একাডেমিক ভাব অনুধাবন করতে শিক্ষার্থীরা হিমশিম খায়। উচ্চতর পর্যায়ে এসে যদি একেবারে মৌলিক বা প্রাথমিক স্তর থেকে শিক্ষাদান শুরু করতে হয়, তবে স্নাতকোত্তর শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ও মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেবল সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। এর পেছনে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করা জরুরি। তা হলো-
প্রয়োজন ও প্রত্যাশার মূল্যায়ন: পোস্টগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা আসলে কী চায়, তাদের শেখার প্রেষণা, মানসিক প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী— এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণালব্ধ তথ্য বা প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।
শিক্ষকদের কাজের চাপ: মানসম্মত শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অতিরিক্ত কাজের চাপ একটি বড় বাধা। চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষাদানের দ্বৈত দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর কেন অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে এবং তা লাঘবের উপায় কী, তাও তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা প্রয়োজন।
জীবনযাত্রার বাস্তবতা: পেশাগত প্রস্তুতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও বিবেচনায় নেওয়া আবশ্যক। তাদের অনুপস্থিতি বা শিখন ঘাটতিকে কেবল ‘অনাগ্রহ’ হিসেবে না দেখে তাদের বাস্তব পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করা প্রয়োজন।
তিন. ‘গবেষণা প্রথম’ নীতি ও আন্ডারগ্র্যাজুয়েট সংস্কার: স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্রে যেকোনো নতুন শিক্ষণ পদ্ধতি বা নীতি প্রবর্তনের আগে ‘গবেষণা প্রথম’ নীতি গ্রহণ করা উচিত। বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও প্রমাণ ছাড়া কেবল প্রশাসনিক বা ওপরের স্তরে বসে সিদ্ধান্ত নিলে দীর্ঘমেয়াদি বা কার্যকর সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়; বিশেষ করে মাত্র তিন বছরের স্নাতকোত্তর কোর্সে একইসঙ্গে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মূল বিষয়, গবেষণা পদ্ধতি, পরিসংখ্যান এবং কম্পিউটার সাক্ষরতা শেখানো অত্যন্ত কঠিন। তাই স্নাতক পর্যায় থেকেই মৌলিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তা হলো-
= স্নাতক পাঠ্যক্রমেই পরিসংখ্যানের মৌলিক ধারণা (যেমন- গবধহ, গবফরধহ, গড়ফব) এবং ‘রিসার্চ লিটারেসি’ শক্তভাবে গড়ে তুলতে হবে।
= স্নাতক স্তর থেকে গবেষণার শক্ত ভিত্তি তৈরি না হলে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে এসে থিসিস ও উচ্চতর পাঠক্রম শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক ও একাডেমিক চাপ সৃষ্টি করে।
চার. আধুনিক শিখন-পদ্ধতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সংযোগ: প্রচলিত স্লাইড বা পাওয়ারপয়েন্ট নির্ভর বক্তৃতার পরিবর্তে ক্লিনিক্যাল কেস অ্যানালিসিস, উপসর্গ বিশ্লেষণ এবং সিস্টেম অ্যানালিসিসের ওপর জোর দেওয়া উচিত। বহির্বিভাগ থেকে বাস্তব রোগী এনে তাদের উপসর্গ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সঠিক রোগ নির্ণয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাকটিক্যাল লজিক এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যশিক্ষাকে সমসাময়িক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন জটিল উপসর্গ সমন্বিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়া সহজতর করতে এআই-ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক ও গবেষণাভিত্তিক মডেল তৈরি করা এখন সময়ের দাবি- যা সার্বিকভাবে পুরো চিকিৎসক সমাজকে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।
রূপান্তরের শেষ কথা: চিকিৎসা শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর অর্জনে কোনো একক লেকচার পদ্ধতি পরিবর্তন বা বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। বরং সমস্যা ও প্রয়োজন সঠিকভাবে নির্ধারণ, গবেষণা নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত রূপরেখা তৈরি করতে হবে। তবেই দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যবস্থা একটি ফলাফলমুখী, টেকসই ও আন্তর্জাতিক মানের শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রিউমাটোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬
