১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশে হামে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকাগুলোর একটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট। সেখানে দুই বছর বয়সী শিশু আরমান হোসেন গত জুলাইয়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তাকে টিকা দেওয়া হয়নি। আরমানের বাবা তার তিন চাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি বিক্রি করে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। ভর্তির ২৪ ঘণ্টা পরই তার মৃত্যু হয়। তার চার বছর বয়সী বোনকেও টিকা দেওয়া হয়নি। সেও হামে আক্রান্ত হয়েছিল, তবে বেঁচে গেছে।
এদিকে হামে মৃত্যু লাবিবা আক্তারের বাবা-মা তাদের ৯ মাস বয়সী মেয়ের একটি পোশাক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছেন। মেয়েটি জুন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এদিকে বর্তমান বিশ্বে হামের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে লড়াই করছে বাংলাদেশ। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, সব মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাতে না পারা এবং টিকাদানের ঘাটতির কারণে এই সংকট আরো তীব্র হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে কতটা প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি সেটা দেখিয়ে দিয়েছে। অন্যান্য দেশের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার রোগীর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে এ রোগে মারা গেছেন ১ হাজার ১৪৭ জন। মৃতদের ৯৪ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নীচে। গত ১৭ অক্টোবর শনিবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যা বেশি। যা এখন মহামারি আকারে ছড়াচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আরো জানিয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ছন্দপতন ঘটে। চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে প্রায় ২ লাখ ২ হাজার ব্যক্তির শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার জনের হাম নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ বছর বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে হাম উপসর্গের রোগীর সংখ্যা বেশি। ডব্লিউএইচও বলছে, অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। যেসব মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের ভিতরে ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা কতটা কঠিন হয়ে পড়ে। ডব্লিউএইচও বলছে, রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে টিকাদানের হার অন্তত ৯৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ প্রায় এই লক্ষ্যে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও বড় সতর্কবার্তা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ২ হাজারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার রোগীর হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নথি এবং এক ডজনের বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লাখ লাখ শিশুর তথ্য তালিকায় না থাকা, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত অভিভাবকের কাছে পৌঁছাতে না পারা।
জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়েছে লাখ লাখ শিশু : হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুত জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করে। এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির গতি প্রথম দিকে কমে আসে। সরকার জানিয়েছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী লক্ষ্যভুক্ত প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী তথ্য সেই দাবির সঙ্গে অসংগতি তুলে ধরে। জুন মাসে পরিচালিত আরেকটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে একই বয়সসীমার শিশুদের জন্য তৈরি তালিকায় হামের টিকাদান কর্মসূচির তুলনায় ৪০ লাখ বেশি শিশুর নাম পাওয়া যায়। এতে জরুরি কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক শিশু বাদ পড়ার বিষয়টি অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যা সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছিলেন, তালিকার এই ব্যবধানের পেছনে অভিভাবকদের টিকা নিয়ে অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতার কারণে টিকাকেন্দ্রে না আসার বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে। এই উপদেষ্টা আরো বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া পদক্ষেপ একসময় প্রাদুর্ভাব থামিয়ে দেবে। কিন্তু এর মধ্যে অনেকেই হামে আক্রান্ত হবেন এবং কেউ কেউ মারা যাবেন। তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার গত সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধ করতে সরকার সম্ভাব্য সবকিছুই করছে। তবে এই প্রতিবেদন নিয়ে অক্টোবরে পাঠানো রয়টার্সের আরো প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার।
প্রস্তুতির ঘাটতিও বাড়িয়েছে চ্যালেঞ্জ: রয়টার্সের পর্যালোচনা করা সরকারি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থার এপ্রিল ও আগস্টের বৈঠকের নথিতেও জরুরি কর্মসূচির কিছু সীমাবদ্ধতার তথ্য উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে প্রচলিত চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাই করা হয়েছিল। এসব যাচাইয়ের মধ্যে টিকা সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং কতসংখ্যক শিশুকে টিকা দিতে হবে, তা নির্ধারণের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে। গত ১৯ এপ্রিলের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, এক দফা যাচাইয়ে অধিকাংশ জেলা প্রস্তুত বলে প্রতীয়মান হলেও সব জেলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে, সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর টিকা বিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, এটা প্রতিটি দেশের জন্য বাস্তব এক সতর্কবার্তা।’ মার্ক জিট বলেন, টিকাদানের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব ঠেকানো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার চেয়ে সহজ, কম ব্যয়বহুল এবং নিরাপদ। এদিকে মারা যাওয়া শিশু লাবিয়ার বাবা হুমায়ুন রশীদ জানান, (টিকাদান কর্মসূচির খবর) আমাদের জানাতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি।
বিআলো/অর্নব