ইসরায়েলে আগামী সপ্তাহের নির্বাচন দেশটির নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে পারে, তবে ইরানকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা, সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার মতো নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। আঞ্চলিক নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের হামলা এবং এরপর গাজা, লেবানন ও ইরানে যুদ্ধ ইসরায়েলের নিরাপত্তানীতির ভিত্তিকে আরও কঠোর করেছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় ফিরলে দেশটির সামরিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগকে কম গুরুত্ব দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
ইসরায়েলের বর্তমান নিরাপত্তানীতির তিনটি প্রধান ভিত্তি হলো ইরানের সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, সীমান্তের বাইরে নিরাপত্তা বলয় ধরে রাখা এবং শত্রুপক্ষকে নিবৃত্ত করতে সামরিক শক্তি প্রয়োগ। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর নীতির মূল দিক বদলানোর চেয়ে সামরিক অভিযান কতটা জোরালো হবে, পশ্চিম তীরে বসতি কতটা সম্প্রসারিত হবে এবং কূটনীতির সুযোগ কতটা রাখা হবে এসব ক্ষেত্রেই পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
নেতানিয়াহু জিতলে আরও কঠোর হতে পারে নীতি
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী লিকুদ পার্টি ও তাদের কট্টর জাতীয়তাবাদী মিত্রদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল ইয়াশার। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, যে পক্ষই ক্ষমতায় আসুক, ইরান ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরায়েলের অবস্থানে মৌলিক পরিবর্তন আসবে না।
নেতানিয়াহুর সাবেক উপদেষ্টা আভিভ বুশিনস্কি বলেন, নেতানিয়াহু নির্বাচিত হলে তিনি নিজের ইচ্ছামতো পদক্ষেপ নেবেন। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে। ইরান, হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধও চলবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ইসরায়েলে যা দেখা যাচ্ছে, পরে তা-ই দেখা যেতে পারে এমনকি আরও আগ্রাসীভাবে। তার মতে, ইরান বর্তমান পরিস্থিতিতে থাকা অবস্থায় ফিলিস্তিন নিয়ে আলোচনা করা সময়ের অপচয়।
রোববার নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলকে প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার চেয়ে আগাম হামলা এবং আক্রমণাত্মক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উদীয়মান হুমকি ঠেকাতে আগাম হামলা চালানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের অবস্থান জোরদার এবং অস্ত্র উৎপাদনে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ
ফিলিস্তিনি বিশ্লেষক গাসান আল-খতিবের মতে, ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ইসরায়েলের নীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো জনমত আরও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ায় কঠোর অবস্থান তুলে ধরতে প্রতিযোগিতা করছে।
আল-খতিব বলেন, নীতির মূল বিষয় একই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা এবং ইহুদি বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান। এ বিষয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে।
নেতানিয়াহুর বিরোধীরা সরকার গঠন করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বসতি স্থাপনকারীদের কিছু সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ কিংবা বসতি সম্প্রসারণ তুলনামূলক কম প্রচার করে চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এসব পরিবর্তন নীতির মৌলিক রূপ বদলানোর বদলে কৌশলগত বা উপস্থাপনাগত পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন আল-খতিব।
কার্নেগি মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রের গবেষক মাইকেল ইয়ং বলেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় একটি অংশের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম। ইরানকে মোকাবিলা, সীমান্তের বাইরে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামরিক শক্তির মাধ্যমে শত্রুপক্ষকে নিবৃত্ত রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। ফলে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান মিত্রদের ওপর হামলায় অর্থায়ন, বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদে সমর্থন এবং অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডে তেল আয়ের অর্থ ব্যয় করলে তেহরানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে ওয়াশিংটন সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।
তবে পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করার বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, পশ্চিম তীরে স্থিতিশীলতা ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জনেও সহায়ক।
ইরানকে ঘিরেই কি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তানীতি?
নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু নেতা মনে করেন, ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুই ইসরায়েলের সবচেয়ে কার্যকর নেতা হতে পারেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে প্রশংসা করেছেন। এতে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় ফিরলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শেষ করার চেষ্টা আরও জোরদার করবেন এমন ধারণা শক্তিশালী হয়েছে।
নেতানিয়াহু ইরানকে শুধু নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলছেন না; দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার পতনও তার লক্ষ্য। বুধবার এক সামরিক কর্মকর্তাদের স্নাতক সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এই হুমকি চিরতরে দূর করার একমাত্র উপায় হলো ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন। সেনাবাহিনী, মোসাদ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থাকে এ বিষয়ে নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
তবে সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্থল অভিযান ছাড়া ইরানকে তার মৌলিক নিরাপত্তাস্বার্থ থেকে সরে আসতে বাধ্য করা সম্ভব কি না। কয়েক মাসের যুদ্ধের পরও টিকে থাকা তেহরান মনে করতে পারে, আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে চাপ বজায় রেখে তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারবে।
ইয়ং বলেন, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী জটিল পরিস্থিতি। তার মতে, ইরান ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে পারে।
লেবাননের হিজবুল্লাহ ও গাজার হামাস দুর্বল হয়ে পড়লেও ইরানপন্থী বৃহত্তর গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক টিকে রয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, চলমান সংঘাত তেহরানকে পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করতে পারে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে দ্বিধা
গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেন, গাজা, পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও লেবাননে নেতানিয়াহুর নীতি ক্ষতিকর। ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ার আগেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন।
তবে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মধ্যপ্রাচ্য আগামী ৫০ বছর ইরানের আধিপত্যের দিকে এগিয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের নির্বাচন তাই শুধু নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার বিষয় নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের যুগে প্রবেশ করছে কি না, তারও একটি পরীক্ষা। নির্বাচনে যে পক্ষই জয়ী হোক, ইরানকে ঘিরে সংঘাত, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনিশ্চয়তা এবং সামরিক শক্তিনির্ভর নিরাপত্তানীতি আপাতত অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই বেশি।
