রাশিয়ায় ভালো চাকরি করে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন ফরিদপুরের নগরকান্দার রাজু মাতুব্বর (২৮)। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তার মৃত্যুর খবর। তবে এখনো তার মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
রাজু নগরকান্দা উপজেলার মাঝিকান্দা গ্রামের নান্নু মাতুব্বরের ছেলে। গত ৮ মে রাশিয়ায় যাওয়ার পর থেকে তার পরিবারের স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তায়। আড়াই বছরের ছেলে ও এক বছরের মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে স্ত্রী শারমিন আক্তারের। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা নান্নু মাতুব্বর ও মা রাজিয়া বেগম।
পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী কফাইবালিয়া গ্রামের প্রিন্স মাতুব্বর ও তার ছোট ভাই রানার মাধ্যমে সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় রাজুকে রাশিয়ায় পাঠানোর চুক্তি হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছিল। বাকি ১০ লাখ টাকা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দেয়ার কথা ছিল। তবে সেখানে গিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পাননি রাজু।
পরিবারের দাবি, তাকে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় প্রিন্স ও রানাকে দায়ী করছেন স্বজনেরা। এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতুল নামের এক যুবকের ফেসবুকে প্রকাশ করা ভিডিওতে রাজুর মৃত্যুর দাবি করা হয়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর রাজুর পরিবারের সদস্যরা রাতুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। রাজুর ছোট ভাই রাজন মাতুব্বর জানান, রাতুলও তার ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বলেছেন। তবে কখন, কোথায় ও কীভাবে রাজুর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি।
রাজুর বাবা নান্নু মাতুব্বর জানান, ছেলেকে ভালো চাকরির আশায় বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন তার মৃত্যুর খবর শুনছেন, কিন্তু প্রকৃত ঘটনা জানতে পারছেন না। ছেলের সন্ধান ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান তিনি।
রাজুর স্ত্রী শারমিন আক্তার দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এই নারী স্বামীর প্রকৃত অবস্থা জানতে চান। রাজু জীবিত থাকলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার এবং মৃত্যুর খবর সত্য হলে মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
তবে পরিবারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত প্রিন্স মাতুব্বরের ছোট ভাই রানা। তার দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে রাজুকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। রাজু নিজেই রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে যান। তাকে প্রতারণা করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রিন্স মাতুব্বরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। রাজুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে রাজুর প্রকৃত অবস্থান ও মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর হস্তক্ষেপ চেয়েছে পরিবার। তাদের দাবি, রাজু জীবিত থাকলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক। আর মৃত্যুর খবর সত্য হলে মরদেহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক।
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনেও নিশ্চিত হতে পারছেন না বাবা-মা। দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় স্ত্রী। রাজু বেঁচে আছেন, নাকি যুদ্ধক্ষেত্রেই শেষ হয়েছে তার জীবন, এখন সেই উত্তরই খুঁজছে পুরো পরিবার।
