ভূস্বর্গ খ্যাত কাশ্মীর উপত্যকা সব সময় অশান্ত ও অস্থির। সেখানে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে এবং ভারত সরকারের পোড়ামাটি নীতির কারণে ইতোমধ্যেই মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। গত ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট লোকসভায় ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিষয়ক সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রহিত করার ঘোষণার পরই জম্মু-কাশ্মীর নতুন করে অশান্ত হয়ে ওঠে। ভারত সরকার বিক্ষুদ্ধ জনতার বিক্ষোভ ঠেকাতে পুরো রাজ্যে কার্ফু জারি করেছে। বন্ধ করে দেয়া হয় টেলিযোগাযোগ সহ ইন্টারনেট পরিষেবাও। ফলে কাশ্মীর উপত্যকা গোটা বিশ্ব থেকেই কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কাশ্মীরিরা অভিযোগ করেছেন যে, ভারত সরকার অধিকৃত কাশ্মীরে ব্যাপক গণহত্যা চালানোর জন্য এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বহির্বিশ্ব থেকে জম্মু-কাশ্মীর প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকায় আসলে কী ঘটছে তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও সেখানে যে ভারত সরকারের দলন-পীড়ন চলছে তা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ভারত সরকারের এমন একতরফা সিদ্ধান্ত কেউই যৌক্তিক মনে করছেন না। কেউ কেউ বিষয়টিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে বিবেকবিরুদ্ধ চাটুকারিতায় লিপ্ত হলেও ভারতের প্রধান বিরোধী দলসহ রাজনৈতিক পক্ষ, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী মহল, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞসহ সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষ এ সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক, একপেশে ও অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত বলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে। ‘কাশ্মীর সঙ্কটের একমাত্র সমাধান গণতন্ত্র’-এমনটিই মন্তব্য করেছেন ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা সম্বলিত ৩৭০ ধারা তুলে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘এই অযাচিত পদক্ষেপে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠের মানুষের কথা ভাবা হয়নি। গোটা বিশ্বে গণতান্ত্রিক আদর্শ অর্জনের জন্য ভারত অনেক কিছুই করেছে। তবে এখন আর আমি একজন ভারতীয় হিসেবে এই সত্য নিয়ে গর্বিত নই’।
সরকারের এ একতরফা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মী অরুন্ধতী রায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি অচিরেই ভারতজুড়ে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। শুধু তাই নয়, এর ফলে ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপরও কালোছায়া নেমে আসবে বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সে ধারাবাহিকতায় প্রতিবেশি এ দেশটিতে নির্মম ও নিষ্ঠুর মুসলিম নির্যাতন চলছে। যেখানেই মসজিদ সহ মুসলিম স্থাপনা সেখানেই তথাকথিত শিব লিঙ্গের অস্তিত্ব খোঁজা হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গে উগ্রপন্থীরা ক্ষমতায় রাজ্যটিতে চলছে নির্মম মুসলিম দলনপীড়ন। গত ২০১৯ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত ‘দ্য সাইলেন্স ইজ দ্য লাউডেস্ট সাউন্ড’ শিরোনামে অরুন্ধতী রায়ের একটি নিবন্ধ নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত হয়েছিলে। এতে তিনি বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট বিজেপি সরকার একতরফাভাবে জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন পুরোপুরি বাতিল করার পর সব ধরনের ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা উল্লাস প্রকাশ করে। এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও পরোক্ষভাবে সমর্থন দেয় এতে। রাস্তায় নেচে নেচে উল্লাস করে অনেকে। আর ইন্টারনেটে শুরু হয় কাশ্মীরি নারীদের প্রতি ভয়াবহ ধর্ষণকামের চর্চা’।
বর্ণিত সালের ১৪ আগস্ট ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকায় এ বিষয় নিয়ে একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ কলাম লিখেছেন ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ। তিনি তার নিবন্ধে লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষ ছিল গণতন্ত্রের জন্য একটি চমৎকার নমূনা। কিন্তু কাশ্মীরের আঞ্চলিক স্বাধীনতা হরণ, হিন্দুত্ববাদের উত্থান আর সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি উগ্রাবাদী আচরণের কারণে ভারতের সে প্রশংসাগুলোকে ‘ডাউনগ্রেড’ করার সময় এসেছে’। তিনি হিন্দুত্ববাদের উত্থান নিয়ে বলেছেন, ‘গত শতাব্দীর ৮০’র দশক থেকে বিজেপি ভারতে যে হিন্দুত্ববাদের জাগরণ তুলছে, তাতে বলা যায়-১৯৪৭ সাল থেকে যেকোন সময়ের চেয়ে এখন ভারত ‘হিন্দু পাকিস্তান’ হওয়ার কাছাকাছি’।
ভারত সরকারের এ একতরফা সিদ্ধান্তে শুধু অভ্যন্তরীণভাবেই নয় বরং গোটা বিশ্বেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তে কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আন্দোলন দমাতে অতিমাত্রার বলপ্রয়োগকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোন মহলের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। জম্মু ও কাশ্মীরে সৃষ্ট অচলাবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘জম্মু ও কাশ্মীরের মর্যাদা ক্ষুন্ন করে এমন কোনো পদক্ষেপ যেন ভারত ও পাকিস্তান না নেয়’। জাতিসংঘের পক্ষে আরও বলা হয়, ‘মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর উপত্যকার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে সে সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলের প্রশাসন ও জনগণ নিজেরাই নেবে, এ মর্মে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একাধিকবার রেজুলেশন গৃহীত হয়েছে’। বিষয়টি নিয়ে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা ওআইসি, আরবলীগ সহ বিশ্ব সংস্থাগুলো জাতিসংঘের অনুরূপ অবস্থানই গ্রহণ করেছে।
প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। চীন বিষয়টির কড়া সমালোচনা করেছে। তুরস্ক, ইরান সহ মুসলিম বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্রই কাশ্মীরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের অনুকূলেই তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনী কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর বল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার অবস্থানও কাশ্মীরিদের পক্ষে চলে গেছে। মূলত ভারত এই ইস্যুতে অনেকটা ব্যাকফুটে পড়েছে বলেই মনে হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাশ্মীর বিরোধ নিরসনে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার আগ্রহ প্রকাশ করায় দেশটি স্বীকার করে নিয়েছে যে, বিষয়টি একটি আন্তর্জাতিক ইস্যু। ভারতের ক্ষুদ্র ও শক্তিহীন প্রতিবেশীরা বিষয়টি নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া না দেখালেও তাদের অবস্থান কাশ্মীরি জনগণের পক্ষেই। সীমাবদ্ধতার কারণেই হয়তো তারা মুখ খুলতে পারছে না।
মূলত ৩৭০ অনুচ্ছেদটি ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর। ১৯৫৪ সালে এর সঙ্গে ৩৫-এ ধারা যুক্ত করা হয়। ৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর অন্য যেকোনো ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতো। আর এ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতেই কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ অনুচ্ছেদ অনুযায়ি ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়। এছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সব ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেয়। ৩৭০ ধারা বাতিলের আগ পর্যন্ত কাশ্মীরের নাগরিকেরা এসব সুবিধা ভোগ করতেন এবং তারা আঞ্চলিকভাবে প্রায় স্বাধীনই ছিল।
ভারত জম্মু-কাশ্মীরকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করলেও ইতিহাস সে কথার সায় দেয় না। মূলত কাশ্মীর অতীতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল। কিন্তু রাজা হরি শিং-এর বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই কাশ্মীর ভারতীয় ইউনিয়নভুক্ত হয়। কিন্তু রাজা হরি শিং কাশ্মীরের মালিক নয় বরং কাশ্মীরের জনগণই কাশ্মীরের মালিক। তাই জম্মু-কাশ্মীরকে কোন দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ না মনে করে ‘বিরোধপূর্ণ’ বলাই যৌক্তিক। আর এই বিরোধের কারণেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯-এ অন্তত তিনটি যুদ্ধ হয়েছে।
ভারত সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি তাদের বলে দাবি করে। জম্মু বেশিরভাগ অংশ, কাশ্মীর উপত্যকা, লাখাদ এবং সিয়াচেন হিমবাহ নিয়ে প্রায় ৪৩% অঞ্চল শাসন করছে। পাকিস্তান এই দাবির বিরোধিতা করে আসছে শুরু থেকেই। দেশটি কাশ্মীরের প্রায় ৩৭% নিয়ন্ত্রণ করে-এর মধ্যে আছে আজাদ কাশ্মীর এবং গিলগিট বাল্টিস্থানের উত্তরাঞ্চল।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯২৫ সালে হরি সিং কাশ্মীরের রাজা হন। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন কাশ্মীরের শাসক। যে মানদন্ডে ভারত বিভাজিত হয়েছিল সে অনুযায়ি কাশ্মীর পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর হরি সিং বিদ্রোহী আক্রমণের অজুহাতে ভারতভুক্তির চুক্তিতে সই করেন। যা ছিল কাশ্মীরের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতি ও চিন্তা-চেতনার সাথে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। ২৭ অক্টোবর তা ভারতের গভর্নর জনারেল কর্তৃক অনুমোদিত হয়। চুক্তি সই হওয়ার পর, ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং ভারত বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। জাতিসংঘ ভারত ও পাকিস্তান তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের প্রস্তাব দেয়। এবিষয়ে জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে ৪৭ নং রেজুলেশনও গ্রহণ করে। ভারত প্রথমে এ প্রস্তাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত গণভোটে অসম্মত হয় এবং এজন্য পাকিস্তানও সেনা প্রত্যাহারে অসম্মতি জানায়। কারণ, ভারত নিশ্চিত ছিল যে গণভোটের রায় কখনোই ভারতের পক্ষে যাবে না।
কোন মানদণ্ডেই জম্মু-কাশ্মীর ইস্যুকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় মনে করার কোন সুযোগ নেই। জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এই মর্মে জম্মু-কাশ্মীর হাইকোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ও রয়েছে। ২০১৫ সালে প্রদত্ত রায়ে সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ‘বাতিল বা সংশোধনযোগ্য নয়’ বলেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। হাইকোর্টের আদেশে বলা হয়েছে, Kashmir is not part of India and thus can not be amalgamated in India. Under the article of 370 constitution, Kashmir is an autonomous area’.
www.syedmasud.com
