বত্রিশ বছরের দীর্ঘ নির্বাসনের যন্ত্রণা এবং নিজের জন্মভূমির মাটি থেকে দূরে থাকার অন্তহীন বেদনাকে সঙ্গী করে অবশেষে কলকাতার বুকে পা রাখলেন বিতর্কিত ও প্রখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। বুধবার মহালয়ার সন্ধ্যায় কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইডেন গার্ডেন্সে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য শারদোৎসবের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে তিনি এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলেন। বহু বছর ধরে ওপার বাংলায় প্রবেশাধিকার না থাকা এবং রাজনৈতিক পালাবদলেও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন না হওয়া এই সাহিত্যিক অবশেষে এমন এক উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলেন, যা তাঁর দীর্ঘ জীবনের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি হয়ে রইল।
মহালয়ার সন্ধ্যার সেই জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে ইডেন গার্ডেন্সে পৌঁছানোর পর তসলিমা নাসরিনকে ভিভিআইপি সারিতে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আসন গ্রহণ করানো হয়। তাঁর বাঁ পাশে বিধানসভার স্পিকার, ডানে কিংবদন্তি অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী, শমীক ভট্টাচার্য এবং পেছনের সারিতে স্বপন দাশগুপ্তের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্যে প্রথমে কিছুটা জড়তা অনুভব করলেও লকেট চট্টোপাধ্যায়, অগ্নিমিত্রা পালসহ অন্যান্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা তাঁর খোঁজখবর নেন এবং আন্তরিক কুশল বিনিময় করেন। চারপাশের এই আভিজাত্য ও মানুষের ভালোবাসায় মুহূর্তেই এক অন্যরকম আবহ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠান চলাকালীন যখন কলকাতার আকাশে এক মনোমুগ্ধকর ড্রোন শো চলছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং ভিড়ের কোলাহল পেরিয়ে এগিয়ে আসেন নির্বাসিত এই লেখিকার কাছে এবং পরম যত্নে তাঁর খোঁজ নেন। এরপর অনুষ্ঠান শেষে বিদায় নেওয়ার অন্তিম মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রী তসলিমা নাসরিনের সামনে মাথা নুইয়ে, হাত জোড় করে বিনম্র শ্রদ্ধা জানান এবং অত্যন্ত আন্তরিক সুরে বলেন, 'বার বার আসুন, বার বার আসুন, বার বার আসুন, এই বাংলা আপনার।' মুখ্যমন্ত্রীর এই অপ্রত্যাশিত ও দালানকোঠা ভেদ করা মায়াবী সৌজন্যে মুহূর্তে স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ হয়ে যান নির্বাসিত লেখিকা।
মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে উচ্চারিত এই কটি জাদুকরি বাক্য তসলিমা নাসরিনের বুকের জমে থাকা দীর্ঘ বত্রিশ বছরের অভিমান ও কষ্টকে এক নিমেষে ভুলিয়ে দেয়। পরবর্তীতে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি লেখেন যে, আজ পর্যন্ত দুই বাংলার কোনো রাজনীতিক বা সরকার তাঁকে এমন আপন করে বলেনি যে এই বাংলা তাঁর, এবং এমন সহজ ভাষায় এত বড় আশ্বাসও কেউ দেয়নি। সুদীর্ঘ নির্বাসনের ক্ষত একটি বাক্যে সম্পূর্ণ মুছে না গেলেও, মুখ্যমন্ত্রীর এই একটিমাত্র বাক্য তাঁর ভেতর যে সুধাসম শান্তি এনে দিয়েছে, তা জীবনের এক অনন্য উপলব্ধি হয়ে রইল। জন্মভূমি থেকে দূরে থাকা এক অভিমানী সাহিত্যিকের জীবনে এই সম্মান যেন বহু বছরের তৃষ্ণার পর এক পশলা শান্তির ঝরনাজল হয়ে ধরা দিল।
