বাঙালি মুসলিম সমাজের জাগরণ, ধর্মীয় চেতনার পুনরুজ্জীবন এবং বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে যে কজন মনীষী কালজয়ী অবদান রেখেছেন, কবি গোলাম মোস্তফা তাদের মধ্যে অন্যতম। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন বাঙালি মুসলমান সমাজ আধুনিক শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগছিল তখন তিনি তার লেখনীর মাধ্যমে সেই সমাজে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং শিক্ষক। ইসলামের শাশ্বত আদর্শ, মহানবী (সা.)-এর জীবন মহিমা এবং আধ্যাত্মিক প্রেমকে তিনি তার কাব্যের মূল উপজীব্য করেছিলেন।
কবি গোলাম মোস্তফা ১৮৯৭ সালে (মতান্তরে ১৮৯৫) তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাজী গোলাম রব্বানী এবং পিতামহ কাজী গোলাম সারওয়ার দু’জনেই ছিলেন সাহিত্যানুরাগী-ফারসী ও আরবী ভাষায় সুপন্ডিত ও লোকোকবি।
পারিবারিক পরিমণ্ডলেই কবির সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ গড়ে ওঠে। তাদের পরিবার আরবি, ফারসি এবং বাংলা ভাষার চর্চায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। শৈশব থেকেই পিতার সাহিত্য প্রীতি এবং বাড়িতে নিয়মিত আসা বিভিন্ন সাময়িকী (যেমন: বঙ্গবাসী, হিতবাদী) গোলাম মোস্তফার মনে কবিসত্তার বীজ রোপণ করে।
শিক্ষা জীবন : কবির প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় দামুকদিয়া গ্রামের পাঠশালায়। এরপর তিনি শৈলকুপা হাই স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯১৩ সালে এন্ট্রান্স (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি কলকাতায় গমন করেন এবং ১৯১৮ সালে রিপন কলেজ (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে শিক্ষা বিস্তারে নিজেকে যোগ্য করে তুলতে ১৯২২ সালে ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি (ব্যাচেলর অব টিচিং) ডিগ্রি অর্জন করেন।
সাহিত্য সাধনা : কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্যিক জীবন প্রায় অর্ধশতাব্দী (৪৮ বছর) ব্যাপী বিস্তৃত ছিল। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে ‘সাপ্তাহিক মোহাম্মাদী’তে ‘আন্দ্রিয়ানোপল উদ্ধার’ শিরোনামের কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। এ সময় তাঁর ‘আর্দ্রিয়ানোপল উদ্ধার’ কবিতাটি মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘রক্ত রাগ’ প্রকাশিত হলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিচের দু’লাইন কবিতার মাধ্যমে কবিকে অভিনন্দিত করেছিলেন- “তব নব প্রভাতের রক্তরাগখানি, মধ্যাহ্নে জাগায় যেন জ্যোতির্ময়ী বাণী।”
তার প্রধান সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :
রক্তরাগ (১৯২৪) : এটি কবির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। এতে ইসলামের গৌরবময় ইতিহাস এবং মুসলিম পুনর্জাগরণের সুর ধ্বনিত হয়েছে।
হাসনাহেনা : কবির রোমান্টিক ও প্রেমচেতনার এক অনন্য প্রকাশ এই গ্রন্থটি।
খসরোজ ও সাহারা : এই কাব্যগ্রন্থগুলোতে আধ্যাত্মিকতা, প্রকৃতি প্রেম এবং মানবীয় অনুভূতির চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে।
বনি আদম (১৯৫৮) : মানবজাতির সৃষ্টি, ক্রমবিকাশ এবং দার্শনিক তত্ত্বকে কেন্দ্র করে রচিত এই মহাকাব্যধর্মী গ্রন্থটি তার চিন্তাশীলতার পরিচয় বহন করে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে তরানা-ই-পাকিস্তান, বুলবুলিস্তান এবং কবি ইকবালের কবিতার অনুবাদ কালাম-ই-ইকবাল।
কালজয়ী জীবনীগ্রন্থ : ‘বিশ্বনবী’বাংলা সাহিত্যে কবি গোলাম মোস্তফার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ তার রচিত ‘বিশ্বনবী’ (১৯৪২) গ্রন্থটি যার চুয়ান্ন তম সংস্করন বাজারে চলমান। এটি ইসলামের শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবনের ওপর আধারিত একটি অসাধারণ জীবনীগ্রন্থ। ‘বিশ্বনবী’ একটি আশ্চর্য রকমের সফল সৃষ্টি। এই অমর গ্রন্থখানি গদ্যে রচিত হলেও সে গদ্যও কবিতার মত ছন্দময় এবং মধুর। গ্রন্থখানা বিশ্বনবী হয়রত মুহম্মদ (সঃ) এর একটি সার্থক জীবন চরিত। গ্রন্থটিতে হৃদয়ের আবেগ, আন্তরিক অনুভূতি যে ভাবে বর্ণিত হয়েছে তার তুলনা আমাদের বাংলা সাহিত্যে নিতান্তই বিরল। এর পরবর্তীকালে তিনি কোরানিক ঘটনার অমিত্রাক্ষর ছন্দে ‘বনি আদম’ নামে একটি মহাকাব্য লিখেছিলেন। যা বাংলা সাহিত্যে এক অমর ও অক্ষয় কীর্তি। বহু অমুসলিম পণ্ডিত ও সাহিত্যিকও এই বইটির প্রশংসা করেছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এই গ্রন্থটি ভাষা, তথ্য ও দর্শনের দিক থেকে অতুলনীয় এবং এটি কবির গভীর গবেষণা ও নবী-প্রেমের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
এ ছাড়াও তিনি ‘বিশ্বনবীর বৈশিষ্ট্য’ এবং ‘হযরত আবু বকর’ নামক জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। তার লেখা দুটি বিখ্যাত উপন্যাস হলো ‘রূপের নেশা’ এবং ‘ভাঙাবুক’।
অনুবাদ। আল-কুরআন (আংশিক), মুসাদ্দাস-ই-হালী, কালাম-ই-ইকবাল। অনুবাদক হিসেবেও কবি গোলাম মোস্তফার বিশেষ খ্যাতির পরিচয় পাওয়া যায়। আরবী ও উর্দু সাহিত্য হতে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলি ভাষান্তরিত করে বাংলা সাহিত্যকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন। ‘ইখওয়ানুস সাফা’, ‘মুসাদ্দাস-ই-হালী’,- ‘কালাম-ই-ইকবাল’, ‘শিকওয়া’ ও ‘আল-কুরআন’ তার ভাষান্তরিত গ্রন্থগুলির অন্যতম। গায়ক ও গীতিকার হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বিশেষ করে ইসলামী গান, গজল ও মিলাদ মাহফিলের বিখ্যাত ‘কিয়ামবাণী’ (রসুল আহবান বাণী) রচনায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তার অনেকগুলি গান আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠেও রেকর্ড হয়েছিল। এছাড়া নিজের কণ্ঠেও তিনি বেশ কয়েকটি গান রেকর্ড করেছিলেন।
গোলাম মোস্তফার সাহিত্যের বেশির ভাগের মূল বিষয় ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম ঐতিহ্য। তিনি রসাত্মক কবিতা রচনা করলেও কুরআন-হাদিস তথা ইসলামী আদর্শ ঐতিহ্যের প্রতি ছিলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন। কোনো রচনাই যেন ইসলাম পরিপন্থী কিংবা ইসলামের বিকৃত উপস্থাপন না হয় সে দিকে তিনি ছিলেন সদা সতর্ক। ইসলামী চেতনার রূপায়ণই তার সাহিত্য-সাধনার প্রধান উদ্দেশ্য এবং মুসলিম সমাজের সাহিত্য-সংস্কৃতির জাগরণ ছিল তার লক্ষ্য।
পুরস্কার ও স্বীকৃতি : বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবি গোলাম মোস্তফা জীবদ্দশায় ও মরণোত্তর বহু সম্মাননায় ভূষিত হন। যশোর সংঘ থেকে তাকে ‘কাব্য সুধাকর’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে তিনি উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ‘সিতারা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব লাভ করেন। সাহিত্য সেবার জন্য তিনি ‘প্রেসিডেন্ট মেডেল’ (রাষ্ট্রপতি পদক) অর্জন করেন।
পারিবারিক জীবন ও উত্তরাধিকার : ব্যক্তিগত জীবনে কবি গোলাম মোস্তফা চার পুত্র ও তিন কন্যার জনক ছিলেন। তার সন্তানরাও বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশাল অবদান রেখেছেন। তার তিন পুত্রের মাঝে বড়ো ছেলে প্রখ্যাত শিক্ষক মোস্তফা আব্দুল আজীজ দীর্ঘ সময় ধরে ক্যাডেট কলেজে (রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ সহ বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজে) শিক্ষাকতা করেছেন। দ্বিতীয় পুত্র শিল্পী মুস্তফা মনোয়ার এবং সাম্প্রতিককালের অস্কারজয়ী বাংলাদেশী নাফিস বিন জাফর এছাড়াও প্রবাসী কবি ও অনুবাদক ফরিদা মজিদ ও কবি ফাহমিদা মঞ্জু মজিদ তার নাতনী।
এই মহান সাহিত্যসাধক ১৯৬৪ সালের ১৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। কবি গোলাম মোস্তফা কেবল একজন কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালি মুসলিম সমাজের আত্মআবিষ্কারের পথপ্রদর্শক। ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ঊর্ধ্বে উঠে সাহিত্যের নান্দনিক রূপটি বজায় রেখে কীভাবে আদর্শিক চর্চা করা যায়, তা তিনি দেখিয়ে গেছেন।
খুলনা গেজেট/এএজে
