Published on
:
7 min read
শৈলেন সরকার
আমার সঙ্গে মায়ের যেন যুদ্ধ আছে একটা। যত বলি, আমার কথা ভাবতে হবে না তোমাকে, আমি তো বাচ্চা নেই আর— তত সেই এক কথা, আমি চোখ বুজলে কী হবে তোর? কে দেখবে? আপনি নিশ্চিত জীবনের শেষ বেলায় দাঁড়িয়ে পুত্রের প্রতি মায়ের স্নেহের কথাই ভাবছেন, নিজের অকর্মণ্য ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অসহায় মায়ের দুশ্চিন্তা বা...। ধুর, এ সব কথা মায়ের আসলে নিজের অভিসন্ধি লুকোনোর জন্য, নিজের আরও আরও বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছেটাকে বুঝতে না দেওয়ার জন্য। আমার মা-কে আপনি আর কী ভাবে চিনবেন? একটু বুক ঢিবঢিব করা বা পা ঝিমঝিম বা গায়ে ঘাম দিয়ে উঠলেই মায়ের মনে হবে... । আমি বলি, কী হবে মা, বয়স তো অনেক হলো, নব্বই পার হয়ে—, আরও ইচ্ছা হয়? এখন, মানে এই মুহূর্তে মা না হয় অনেক কমজোরি, কথা বলার অনেক কষ্ট। কথা বলার কষ্ট, দেখার কষ্ট, খাওয়ার কষ্ট। আমাকে রাগ করতে দেখে আমার দিকে ওই বোবা তাকানো মানে আগেকার সেই সব মিথ্যে কথাগুলিই। কথা বলার মতো শক্তি না থাকায় ওই তাকিয়ে থাকা, গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়া। কিন্তু আমি তার জন্য কী-ই বা করতে পারি। মা-কে বলিও। বলি, তোমার মৃত্যু আমি কী ভাবে আটকাব মা?
বালিশের নীচে কবেকার এক হালকা-পাতলা ছোট সাইজ়ের গীতা। কিছুক্ষণ পরপরই বের করবে বইটাকে। বের করে একেবারে মলাটে দু’-এক মুহূর্তের জন্য চোখ রেখে খুলবে একবার। তার পর বন্ধ করে ওটাকে মাথায় ছুঁইয়ে ফের বালিশের নীচে। আর রাতে যে এটা কতবার চলবে তা গুনেও শেষ করা যাবে না। খাটের পাশে মাটিতেই শুতে হয় আমাকে। রাত হলেই ভয় যেন মাকে পেয়ে বসবে। অন্ধকার হওয়ামাত্রই যেন পা টিপে টিপে কেউ, মানে মৃত্যুই, আর মা কোনও মতে— ছুটবে আর কোত্থেকে এখন, হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে মৃত্যুর হাত থেকে— । ঘুমের মধ্যে কতদিন জেগে উঠেছি। স্পষ্ট বুঝতে না পারলেও আন্দাজে করতে পারি, মা চেষ্টা করছে কিছু বলার। খুব বেশি বাড়াবাড়ি করলে উঠতেই হয় বিছানা ছেড়ে, কানের কাছে মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করি, কী হলো, খারাপ লাগছে শরীর? না, দেখি ক্ষীণস্বরে বলছে মানে বলার চেষ্টা করছে কিছু। রাতের কদ্দূর বা সকাল হলো কি না। যেন সকাল হলেই আর ভয়ের কিছু থাকবে না। যেন সকাল হওয়ামাত্রই আর একটা দিন পাওনা হয়ে যাবে মায়ের। কতদিন মাঝরাতেও দেখি, বালিশের নীচ থেকে মা বের করছে বইটাকে। খুব বেশি হলে পঁচিশ-ত্রিশ পাতার। কে দিয়েছিল কে জানে, বা পেয়েছিল কোথায়। কভারে ছোট করে ছাপানো কৃষ্ণের ছবি। মাথায় মুকুট, চারটে হাত। ওই যে বলে না, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম। গদা বা পদ্ম দেখিনি, তবে দুই হাতে শঙ্খ আর চক্র আছে সম্ভবত, আর বাঁশি। মুখে বাঁশি আর ঠোঁট টেপা হাসি একটু।
রাতে বাড়ি ফিরছিলাম, রাস্তায় একজন কেউ বলল, আপনার মা-কে তো হাসপাতালে নিয়ে গেল, জানেন না কিছু? সত্যি বলতে কি অবাক হই না একটুও, ছেলেটিকে শুধু বললাম, ভাই কি একাই নিয়ে গিয়েছে মা-কে, না কি আরও কেউ? ভাইকে ফোন করে জানতে চাইলাম, আসতে হবে?
ওর কথায়, যেখানে নিয়ে গিয়েছে ওখানে নাকি হবে না কিছু। জানতে চাই, কোন হাসপাতাল?
হাসপাতাল নয়, নার্সিং হোমে।
কোন নার্সিং হোম?
বলল। চিনতেও পারলাম। এমন কিছু দূরের নয়, হেঁটে গেলেও মিনিট পনেরো। বললাম, ঠিক আছে, আসছি আমি।
জানি আমার এ কথায় ভাইয়ের যায় আসে না কিছু। ও ফোন করবে আমার বোনকে। আমার বোনের আবার মায়ের প্রতি টান খুব।
প্রায় ঘরের কাছেই পৌঁছে গিয়েছিলাম, এখন নার্সিং হোমের দিকে হাঁটতে থাকি। পাড়ার রাস্তা, ওখান থেকে স্টেশনে যাওয়ার বড় রাস্তা, ওখান থেকে বাস রাস্তা।
মায়ের এখন জ্ঞান আছে কি না, কে জানে? আর না থাকলেও বা কী, আমি জানি ওই অজ্ঞানের ঘুমের মধ্যেও মা ঠিক আর একটা সকালের কথা ভাবছে। নিজের অজ্ঞান অবস্থায় প্রথমে ভয় পেয়ে গেছে ঠিক। ভাবছে, কী রে বাবা মরে গেলাম নাকি, বা জেগে উঠতে পারব তো ফের? অজ্ঞানের ওই মনে যখন বুঝবে আরে আমি এখনও বেঁচে আছি তো, মা ঠিক বালিশের নীচে হাতড়াতে চাইবে। আর হাতড়াতে গিয়ে যখন নিজের হাতটাকে অনুভব করতে পারবে না, তখন ফের অবাক হবে। জ্ঞান না ফেরা অবধি মা সারাক্ষণ বালিশের নীচে হাত ঢুকিয়ে...। মাঝে মাঝে মায়ের এই বাঁচার ইচ্ছের বাড়াবাড়ি দেখে গা ঘিনঘিন করে। বলি, আমাদের সবাইকেই মরতে হবে মা, তোমার মতো আমাকেও। আমি বা তোমার ছোটছেলে বা তোমার মেয়ে— আমরা থাকব না তো কেউ। তোমার মতো আমরাও... । অর্থাৎ বোঝাতে চাই, মরতে তোমাকে হবেই, আর আমাদের আগেই।
মা-কে শেষ পর্যন্ত আমাদের বাড়ির কাছের সেই নার্সিং হোম থেকে একটু দূরের এক প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে যেতে হলো। ওখানে টেস্টের ব্যবস্থা আছে নানা রকমের। বোনের বর আমাকে দেখে খেয়ে এসেছি কি না জানতে চাইল। ঘাড় নেড়ে বলতে চাইলাম কিছু একটা। বোনের বর কী বুঝল কে জানে, হঠাৎ দেখি বেশ ব্যস্ত হয়ে দোতলার সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল।
এই হাসপাতালে এর আগেও আমি এসেছি একবার। মায়ের জন্যই। সে বার মায়ের জ্ঞান ছিল না অনেক দিন। আমি ধরেই নিয়েছিলাম, মা বাঁচবে না। কিন্তু বেঁচে গেল। ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হলো ঘরে। মায়ের কথায় ঠাকুর— ঠাকুরের জন্যই। আমার কিন্তু ঠাকুরের উপর রাগ ওঠে খুব। বারবার এই হাসপাতাল-নার্সিং হোম করা ভালো লাগে না আমার। এমনিতে আমার কিন্তু কিচ্ছু না। আমার টাকা না, পয়সা না, আমার কাছে কেউ চাইবেও না কিছু। আসলে নার্সিং হোম বা হাসপাতালের বেঞ্চে বসে থাকতে একদম ভালো লাগে না আমার। ভালো কথা ঠাকুর বলতে মা কার কথা বলল বুঝলেন তো, ঠাকুর মানে কৃষ্ণের, সেই বালিশের নীচে থাকা বইটার মলাটের ছবির ঠাকুর।
বোনের বর দোতলার সিঁড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করায় আমাকে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়তে হয়। বুঝতে পারি না, এ বার কী করতে হবে আমাকে। বোন বা আমার ভাই হয়তো মায়ের বেডের পাশেই। তবে কি মায়ের হলো কিছু? মানে মরেই গেল? তার মানে, কাল থেকে আমাকে আর...। বোনের বরের পথ ধরে দোতলার সিঁড়ির দিকে এগোতেই একটা নীল ড্রেস পরা লোক আটকাল আমাকে। বললাম, আমার মা...। বলল, দু’জনের বেশি লোকের পারমিশন নেই। লোকটা বলল, আগে নামতে দিন একজনকে
‘কিন্তু আমার মায়ের কিছু হয়ে থাকলে, মানে মরে গেলে?’
লোকটি বলল, মরলে ঠিক খবর পাবেন। ওই যে বোর্ড আছে ওখানে নাম উঠবে পেশেন্টের, ডেকে পাঠাবে পেশেন্ট পার্টিকে। তাকিয়ে থাকুন ওদিকে।
আমাকে সুতরাং একটা বেঞ্চে বসে থাকতে হয়। হাসপাতালের বেঞ্চে যেমন হয়, বেশিক্ষণ একা বসে থাকার সুযোগ থাকে না কিন্তু। কেউ না কেউ পাশে বসবে এসে আর জানতেও চাইবে, কে, কে আছে আপনার। বললাম মায়ের কথা। লোকটা এই বছর পঞ্চাশের, বলল, মা বড় সাঙ্ঘাতিক জিনিস, বুঝলেন?
বোনের বর দেখি বেশ হন্তদন্ত হয়ে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে হাসপাতালের গেটের দিকে চলে গেল।
লোকটা বলল, আপনার মায়ের কাছে নেই কেউ, মানে আপনার স্ত্রী বা সন্তানেরা? আপনার ভাই বা...। মা না থাকা মানে...।
তার মানে আমাকেও লোকটাকে জিজ্ঞেস করতে হয় কিছু। জানতে চাইলাম, আপনার? তখনই সামনের বোর্ডে কী একটা নাম দেখে লাফিয়ে উঠল লোকটা। বলে উঠল, আমার আমার...।
বরং হাসপাতালের পেছনের গলিটাতে গিয়ে বিড়ি ধরাই। রাস্তার সাইডে লটকানো হলদে আলোটাকে ঘিরে ঝাঁক ঝাঁক পোকা। ম্যাটাডোর ঢুকছে একটা। নির্ঘাত ডেডবডি কেস। মানে মরেছে কেউ, এবার ডেডবডি...। ম্যাটাডোরের ডালার ওপর বসে জনা চার-পাঁচ। ওরা তার মানে মরার খবর পেয়ে গেছে আগেই। ওই কী একটা টাইম আছে না, চার বা পাঁচ ঘণ্টার। মানে কেউ সত্যি সত্যি মরল কি না, তা শিওর হতে যে সময়টা লাগে। ম্যাটাডোর এই গলির মাথা হয়ে ঢুকল হাসপাতালে।
বিড়ি বের করলাম পকেট থেকে। আগুন জ্বালিয়ে টানতে গিয়েই দেখি ধোঁয়া কোথায়, যেন হাওয়াই টানছি শুধু। ধুস্, ভাঙা। ছুড়ে ফেলে দিলাম রাস্তায়। বের করলাম আর একটা। এবার ধোঁয়া হচ্ছে, ঠিকই আছে তা হলে। হঠাৎ দেখি সামনের কাচের দরজায় একটা লোক। মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করছে বিড়ির। একেবারে রোগা-কালো বিশ্রী চেহারার। হাসপাতালের ওই সাফাইকর্মীই হবে। আরে সাফাইকর্মী কোথায়, আমিই তো। গেটটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেখা যাচ্ছে না আর। বাঁ দিকে জিন্স আর টি-শার্ট পরা মেয়ে একটি। তাকানো যায়, তাকাচ্ছিই। আর মেয়েটি কী কারণে যেন চোখ ফিরিয়েছে এ দিকে, অমনি... । একেবারে হাস্যকর না? মেয়েটি তাকানো মাত্র আমার ওই আধ-খাওয়া বিড়িটাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার কী হলো?
রিং হলো ফোনে। ভাই। বলল, ছিলি কোথায় এতক্ষণ? বললাম, এই তো হাসপাতালের পেছনের গলিতে। বলল, দু’-দু’বার ফোন করে না পেয়ে...। আরও কী সব বলছিল। এর মধ্যেই সেই জিন্স আর টি-শার্ট পরা মেয়েটি একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পড়ল। আঙুলের ছোঁয়ায় কপালের ওপর ছড়িয়ে পড়া চুল ঠিক করে নিল। তাকাল একবার আমার দিকে। বললও যেন কিছু। এ বার হঠাৎ করেই গলি ধরে বড় রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। মেয়েটির গায়ে বেশ চমৎকার গন্ধ ছিল না? গন্ধটা মনে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছিল খুব। আর একবার, ইস্, আর একবার অন্তত পেলে ঠিক
মনে রাখা যেত। মেয়েটির পেছন পেছন এগিয়ে গেলে হয় না? না কি ভাইকে ফোন করব একবার?
হাসপাতালের পেছনের এই গলিটি বড় রাস্তা থেকে এসে একটা পাড়ায় ঢুকে গেছে। দু’দিকে দোতলা-তিনতলা বাড়ি। হলুদ রঙের একটা বাড়ির জানালা দিয়ে বুড়ো মতো একটা লোক। পেছনে ঘরের ভেতরের উড়তে থাকা ক্যালেন্ডারে কোনও ঠাকুরই হবে। কেউ কিছু বলল আমাকে। একটা অটো। এ বার আর একটা। বড় রাস্তার দিক থেকে মেয়ে আসছে দু’টি। সামনে টাকমাথা একটি লোক। মেয়েদু’টি কথা বলছে নিজেদের মধ্যে। একজনের জিন্স, আর এক জনের চুড়িদার। আগের সেই মেয়েটিই আছে কি? আমাকে তা হলে অপেক্ষা করতে হয়। ওদের দু’জনের আসার আগে আগে বরং একটা বিড়ি ধরিয়ে...। এর মধ্যেই ফোন এল ফের। ধরব কি না, ঠিক করার আগেই মেয়েদু’টি এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। একেবারে গায়ে গায়েই। ধরাব বলে হাতে নেওয়া বিড়িটাকে ছুড়ে ফেলে ওদের কিছু বুঝতে না দিয়ে শ্বাস নিই। জিন্সের মেয়েটির ঘাড়ের গায়ে নাক নিয়ে...। আগের সেই গন্ধই তো! রাস্তার দিকে চলে যাওয়া কিছু আগের সেই মেয়েটির জিন্সই ছিল তো। পাশের সেই চুড়িদারের মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে। জিন্সের মেয়েটি কেন কে জানে পাশের মেয়েটিকে কিছু না বলে হাসপাতালের গেটের দিকে হাঁটা লাগাল। কেউ নিশ্চিত আছে ওর ওখানে। সেই টাকমাথা লোকটি কোথায় গেল? লোকটি কি ওদের কেউ ছিল? জিন্সের মেয়েটি যে পথে গেল, আমি না হয়... । যাব? আমার সব ক্ষেত্রেই হয় যেমন, এ বারও তাই, অর্থাৎ দেরি হয়ে গেল ঠিক। কোথায় গেল? আমি একতলার একের পর এক সব ক’টা কাউন্টারে ঘুরে ঘুরে খুঁজতে থাকি মেয়েটিকে। কোনওটা হার্টের, কোনওটা কিডনির, কোনওটা বা চোখের, তা হলে দোতলার দিকেই...। ফের সেই নীল ড্রেসের দারোয়ান থামিয়ে দিলো আমাকে। বলল, বোর্ডে নাম উঠবে পেশেন্টের, ডেকে নেওয়া হবে, বসে থাকুন।
ফের ফোন। ভাই। বলল, কোথায় তুই। ওই ওইটুকুই। ভাই জানে, আমার সঙ্গে বাকি কথা অর্থহীন। অর্থাৎ বাড়ি ফিরতেই হবে আমাকে। অটো বন্ধ হয়ে গেছে মনে হয়। তার মানে রাত অনেক। এবার বড় রাস্তা থেকে স্টেশন রোড, সেখান থেকে পাড়ার রাস্তা। হঠাৎ করে দেখি একটা খুব চেনা গন্ধ না? যেন কতক্ষণ ধরে আমাকে ঘিরে...। আমি যেন গন্ধটাকে অনুসরণ করেই...। কার গন্ধ? সেই মেয়েটি তবে কি...। মেয়েটির খোঁজে এ-দিক ও-দিক করতেই আর নেই। মানে গন্ধটাই। এমনকী গন্ধটাকে আর মনেও করতে পারছি না। তবে কি ভুল কোনও? ইস্, আর একবার, আর একবার মেয়েটাকে দেখতে পেলেই...। বরং হাসপাতাল থেকে চলে না এসে বোর্ডে একটা কোনও নামের অপেক্ষায় বসে থাকলে হতো।
হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে বিড়ি ধরালাম একটা। শুধুই দুটো চায়ের দোকান খোলা এখনও। একটা কুকুর আমাকে হাঁটতে দেখে কী ভাবল কে জানে, একবার তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল। এক সময়ে বড় রাস্তা শেষ হয়ে আমাদের সেই চেনা রোড। ভাঙা সাইনবোর্ড। হলুদ বাল্ব। একটা পাখি বেশ কুব-কুব করে ডেকে উঠল কোথাও। কোনও আড়ালেই। ঘরের দরজাটা খোলাই। বিছানায় মায়ের সেই মশারি। নীচে আমার জন্য পেতে রাখা সেই চাদর। একদিকে বালিশ। মায়ের জন্য আমার ভয় হয়। এক্ষুনি হয়তো রাত কত জানতে চেয়ে... । ঘরে ঢুকতে গিয়ে হঠাৎ দেখি একটা কাগজের টুকরো। খাটের নীচে মেঝেতে পড়ে। টুকরো কোথায়, পাতলা বই-ই একটা। মায়ের সেই চটি বইটাই। ওই অন্ধকারেও কভারের কৃষ্ণ চার হাতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। বরং মায়ের বালিশের তলায় মানে যেখানে ছিল... । নাহ্, এত রাতে আর মায়ের বালিশের তলায় গুঁজে রাখার চেষ্টা করার মানে হয় না কোনও। মা জেগে উঠবে, আর জেগে উঠেই সেই একঘেয়ে অন্ধকারের কথা... , ভয়ের কথা, বেঁচে থাকার জন্য অনর্থক... । দলা পাকানো সেই কৃষ্ণের মলাটওয়ালা বইটাকে চটপট আমার বালিশের নীচে গুঁজে দিয়েই আমি মেঝেয় পেতে রাখা চাদরে শুয়ে পড়ি।
আমার ঘুম পেতে থাকে। আমি
ঘুমিয়ে পড়ি।
