বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি রেল যোগাযোগ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি; তবে দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি সংযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে তা শুধু দুই দেশের মধ্যে যাতায়াতের নতুন পথ তৈরি করবে না বরং বাংলাদেশের পর্যটন, পরিবহন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে চীনের বিশাল পর্যটন বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদকে সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু পর্যটন খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; হোটেল, পরিবহন, খাদ্য, ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্থানীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও এর বহুমুখী প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টির গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ দেশের পর্যটন খাত তার বিপুল প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদের তুলনায় এখনো আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে অনেক পিছিয়ে। ২০২৫ সালে দেশে বিদেশি পর্যটক আগমন ছিল প্রায় ৫ লাখ ৮৫ হাজার; ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে তা প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪০০-তে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম। অর্থাৎ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে নতুন স্থল যোগাযোগব্যবস্থা শুধু পর্যটক আনার একটি মাধ্যম নয় বরং পর্যটন বাজারকে পুনর্গঠনের একটি সুযোগ হতে পারে।
চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিংকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনা এ ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি সমুদ্র-সড়ক-রেল বহুমাত্রিক পরিবহনসেবা চালু হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ সরাসরি রেলপথ না থাকলেও বিভিন্ন পরিবহনমাধ্যম সমন্বয় করে কুনমিং-চট্টগ্রাম সংযোগের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ইতোমধ্যে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ওই ব্যবস্থায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের পথ প্রায় ১৮ দিনে সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রচলিত রুটে সময় লাগত প্রায় ৪০ দিন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, ভবিষ্যতের সরাসরি রেল সংযোগের অর্থনৈতিক যুক্তি কেবল কাগজে-কলমে নয়; এর পেছনে বাস্তব পরিবহন চাহিদাও তৈরি হচ্ছে।
তবে বর্তমান বহুমাত্রিক পরিবহনসেবা এবং ভবিষ্যৎ সরাসরি রেল সংযোগকে এক করে দেখা যাবে না। সরাসরি রেল করিডোর প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে অবকাঠামোগত ও রাজনৈতিক সমন্বয় প্রয়োজন। কিন্তু এই সম্ভাবনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার ইতোমধ্যে আমাদের পাশেই রয়েছে-চীন-লাওস রেলপথ। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে চালু হওয়া ১,০৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ কুনমিংকে লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়ানের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এতে সাড়ে ৬২ কোটির বেশি যাত্রী-ভ্রমণ এবং ৭ কোটি ২৫ লাখ টনের বেশি পণ্য পরিবহনের তথ্য প্রকাশ করা হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে কুনমিং-ভিয়েনতিয়ানের আন্তর্জাতিক যাত্রী ট্রেন চালু হওয়ার পর পর্যটন ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগও দ্রুত বেড়েছে।
চীন-লাওস অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, আন্তর্জাতিক রেলপথের মূল্য শুধু যাত্রী পরিবহনের সময় কমানোতে নয়; এটি একটি নতুন পর্যটন অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করতে পারে। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ইউনান অংশে কুনমিং, ইউসি, পু'এর ও শিসুয়াংবান্নার মতো শহরগুলোর পর্যটন সম্ভাবনা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে দেখানো হয়েছে যে রেল যোগাযোগ প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক ও আন্তঃদেশীয় পর্যটনসম্পদকে একটি সমন্বিত পর্যটন বলয়ে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করেছে। অর্থাৎ রেললাইন নিজে কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়, কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মধ্যে দূরত্বের অর্থনৈতিক বাধা কমিয়ে দিতে পারে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ২০২৬ সালেও চীন–লাওস রেলপথে আন্তঃদেশীয় যাত্রী চলাচল দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে রেলপথটি ৭ কোটি ৩৩ লাখের বেশি যাত্রী পরিবহন করেছে এবং আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা ৮ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। কুনমিং–ভিয়েনতিয়ান আন্তর্জাতিক ট্রেনের দ্রুততম যাত্রা ১০ ঘণ্টারও কম সময়ে সম্পন্ন হচ্ছে এবং সীমান্তে শুল্ক ও অভিবাসন প্রক্রিয়াও প্রায় ৫০ মিনিটে নামিয়ে আনার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ পর্যটকের কাছে শুধু দূরত্ব নয়, যাত্রার পূর্বানুমানযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। যদি সীমান্তে দীর্ঘ অপেক্ষা, জটিল কাগজপত্র বা অনিশ্চিত পরিবহন থাকে, তাহলে দূরত্ব কমলেও পর্যটকের আগ্রহ কমে যায়। বিপরীতে দ্রুত অভিবাসন, সহজ টিকিটিং, বহুভাষিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি থাকলে রেল নিজেই ভ্রমণের আকর্ষণে পরিণত হতে পারে। চীন–লাওস রেলপথে পর্যটকেরা যাত্রাপথের দৃশ্য উপভোগ করাকেও ভ্রমণের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন-বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পাহাড়, নদী, সবুজ ভূপ্রকৃতি ও উপকূলীয় দৃশ্যপটও এমন অভিজ্ঞতা তৈরির সুযোগ দিতে পারে।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার মূল জায়গাটি এখানেই। চীন থেকে একজন পর্যটক যদি বাংলাদেশে এসে শুধু ঢাকা বা একটি নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ না থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ঘুরে দেখতে পারেন, তাহলে একজন পর্যটকের অর্থনৈতিক মূল্য বহুগুণ বাড়বে। পর্যটন তখন শুধু বিদেশি মুদ্রা অর্জনের খাত থাকবে না; এটি স্থানীয় পরিবহন, হোটেল, রেস্তোরাঁ, গাইড, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মধ্যে আয় ছড়িয়ে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হবে।
এখানে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি শিক্ষা চীন–লাওস রেলপথের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া যায়। রেলপথ চালু হওয়ার পর শুধু আন্তর্জাতিক যাত্রী নয়, অভ্যন্তরীণ যাতায়াতও দ্রুত ও সহজ হয়েছে এবং লাওসের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটন সম্ভাবনা উন্মুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক করিডোরের সবচেয়ে বড় সুফল অনেক সময় সীমান্তের দুই প্রান্তে নয়, করিডোরের মাঝখানের অঞ্চলগুলোতেও তৈরি হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক পর্যটক যদি চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারে এসে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সহজে যেতে পারেন, তাহলে পর্যটনের সুফল রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রেল অবকাঠামোর উন্নয়ন তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগকে শক্তিশালী করেছে এবং ভবিষ্যৎ আন্তঃদেশীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। এটি সরাসরি বাংলাদেশ-চীন রেলপথ নয়; কিন্তু আন্তর্জাতিক করিডোর সফল করতে যে অভ্যন্তরীণ সংযোগ প্রয়োজন, তার ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে এ ধরনের অবকাঠামোর গুরুত্ব রয়েছে।
সম্ভাব্য রেল সংযোগের অর্থনৈতিক প্রভাব পর্যটনের বাইরে পণ্য পরিবহনেও বিস্তৃত হতে পারে। চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং চীন থেকে বাংলাদেশে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন পণ্য আসে। নির্দিষ্ট ধরনের সময়-সংবেদনশীল বা উচ্চমূল্যের পণ্যের ক্ষেত্রে রেল সমুদ্রপথের তুলনায় দ্রুত বিকল্প দিতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা মনে রাখতে হবে: রেল সমুদ্রপথকে প্রতিস্থাপন করবে না। বিপুল পরিমাণ ভারী পণ্যের জন্য সমুদ্রপথের খরচ এখনো অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রতিযোগিতামূলক। রেলের প্রকৃত শক্তি হলো সমুদ্র ও বিমানপথের মাঝামাঝি একটি দ্রুত ও তুলনামূলক নির্ভরযোগ্য বিকল্প তৈরি করা।
চীন-ইউরোপ রেল করিডোরের অভিজ্ঞতাও এই বাস্তবতা স্পষ্ট করে। ইউরোপ ও চীনের মধ্যে রেলপথে পণ্য পরিবহন দ্রুত বেড়েছে এবং ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বার্ষিক ট্রেন চলাচল ১,৭০২ থেকে ১৭ হাজারের বেশি হয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপথ এখনো প্রধান পরিবহনমাধ্যম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রেল করিডোরের সাফল্য সমুদ্রবন্দরকে অপ্রয়োজনীয় করে না; বরং বিভিন্ন পরিবহনমাধ্যমকে তাদের নিজস্ব সুবিধা অনুযায়ী ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক গবেষণাতেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। চীন-ইউরোপ রেল সংযোগ নিয়ে ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক রেল অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত শহরগুলোর রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আশপাশের শহরেও ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব ছড়িয়েছে। অর্থাৎ একটি আন্তর্জাতিক করিডোরের সুফল শুধু রেলস্টেশনের আশপাশে সীমাবদ্ধ থাকে না; ভালো সংযোগ থাকলে পার্শ্ববর্তী উৎপাদনকেন্দ্র ও শহরও এর সুবিধা পেতে পারে। বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চল ও আঞ্চলিক শহরগুলোর ক্ষেত্রে এই শিক্ষা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের রপ্তানির ক্ষেত্রেও তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু চীনা পণ্য আনার সুযোগ তৈরি করা নয়; বরং নিজস্ব পণ্যকে আঞ্চলিক বাজারে পৌঁছানোর সক্ষমতা বাড়ানো। পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সম্ভাবনাময় পণ্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে বাজারে পৌঁছাতে পারলে রেল যোগাযোগের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য বাড়বে। এর সঙ্গে গুদাম, শুল্ক, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পণ্য ওঠানামা ও ডিজিটাল সরবরাহব্যবস্থা যুক্ত করতে হবে।
তবে এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় বাধা বাংলাদেশের বাইরে-মিয়ানমারে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্থল রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে অতিক্রম করতে হবে। ফলে মিয়ানমারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও সীমান্ত পরিস্থিতি এই প্রকল্পের বাস্তব সম্ভাবনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা কঠিন। রেলপথ নির্মাণের কারিগরি সমস্যা সমাধান করা সম্ভব; কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সংকটের সমাধান অনেক বেশি জটিল।
এই কারণে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত ‘অপেক্ষা করে থাকা’ নয়, বরং ‘প্রস্তুত থাকা’। দেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারমুখী রেল যোগাযোগ, বন্দর, পর্যটন অবকাঠামো, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল ভ্রমণসেবা এখন থেকেই উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল হলে বাংলাদেশ দ্রুত নতুন করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। একই সঙ্গে চীন ও সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে।
বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাকেও এ সম্ভাবনার জন্য নতুনভাবে প্রস্তুত করতে হবে। সহজ ভিসা, দ্রুত অভিবাসন, অনলাইন টিকিট ও হোটেল বুকিং, চীনা ভাষায় তথ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট, নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্য স্থানীয় পরিবহন-সবকিছুকে একই পর্যটনব্যবস্থার অংশ করতে হবে। একজন পর্যটক সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর যদি আবার প্রতিটি পর্যায়ে নতুন করে জটিলতার মুখোমুখি হন, তাহলে আন্তর্জাতিক রেল সংযোগের গতি পর্যটন অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে না।
পর্যটনের পরিবেশগত স্থায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজার, সুন্দরবন ও পার্বত্য অঞ্চলকে অতিরিক্ত পর্যটনের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত করা হলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদই দুর্বল হবে। তাই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে নীতির অংশ করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যটন আয়ের বড় অংশ যেন স্থানীয় জনগণের কাছে পৌঁছায়, সে জন্য স্থানীয় গাইড, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, হস্তশিল্প, খাদ্য ও আবাসন ব্যবসাকে পর্যটন সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ-চীন রেল সংযোগের মূল্য শুধু রেললাইন কত কিলোমিটার নির্মিত হলো তার ওপর নির্ভর করবে না। চীন-লাওস অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একটি রেলপথ সময়ের সঙ্গে একটি পর্যটন ও অর্থনৈতিক করিডোরে রূপ নিতে পারে; চীন–ইউরোপ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রেল সমুদ্রপথকে সরিয়ে দেয় না, বরং দ্রুততা, নির্ভরযোগ্যতা ও বিকল্প পরিবহনের নতুন মূল্য সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের জন্য এই দুই অভিজ্ঞতার সম্মিলিত শিক্ষা হলো-রেলকে আলাদা প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং পর্যটন, বন্দর, অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ, উৎপাদন ও আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে সমন্বিত একটি করিডোর হিসেবে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশ–চীন সরাসরি রেল সংযোগ এখনো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, বাস্তবায়িত যোগাযোগপথ নয়। মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিস্থিতি এর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার কারণে প্রস্তুতি থামিয়ে রাখা বিচক্ষণ হবে না। বরং বাংলাদেশের উচিত এমনভাবে নিজের অবকাঠামো ও নীতিকে প্রস্তুত করা, যাতে সুযোগ তৈরি হলে দ্রুত তা কাজে লাগানো যায়।
একটি রেলপথ বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে; কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সেই রেলপথের প্রকৃত মূল্য হবে আরও বড়-এটি বাংলাদেশের পর্যটনকে নতুন বাজারে পৌঁছাতে, আঞ্চলিক অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং দেশের ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। সেই অর্থে বাংলাদেশ-চীন রেল সংযোগ কেবল একটি পরিবহন প্রকল্প নয়; এটি হতে পারে বাংলাদেশের জন্য পর্যটন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের একটি নতুন দিগন্ত।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট, Mizan12bd@yahoo.com
