একটি জাতির প্রাণস্পন্দন হলো তার বিশ্ববিদ্যালয়। হৃদপিণ্ডের স্পন্দন ছাড়া যেমন মানবদেহ অচল, ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ ও অনুকূল পরিবেশ ব্যতিরেকে শিক্ষার প্রকৃত মান অর্জন প্রায় অসম্ভব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারখানা।
একটি জাতির প্রাণস্পন্দন হলো তার বিশ্ববিদ্যালয়। হৃদপিণ্ডের স্পন্দন ছাড়া যেমন মানবদেহ অচল, ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ ও অনুকূল পরিবেশ ব্যতিরেকে শিক্ষার প্রকৃত মান অর্জন প্রায় অসম্ভব। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয় মানুষ গড়ার কারখানা। অথচ স্বাধীনতার দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজও নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব হয়ে উঠতে পারে নি। সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরচেনা নৈরাজ্য ও দলীয়করণের অন্ধ সংস্কৃতি বদলায় না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের পর সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল- এবার বুঝি ক্যাম্পাসগুলো থেকে হত্যা, খুন ও র্যাগিংয়ের কলঙ্ক মুছে গিয়ে শান্তির সুবাতাস বইবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে অন্ধকারের অবসান ঘটে নি। বরং সবুজ ক্যাম্পাসের অস্থিরতা দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে। আজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কাল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ কিংবা পরশু চট্টগ্রামের চুয়েট- প্রতিদিনই খবরের শিরোনামে যুক্ত হচ্ছে নতুন কোনো সংঘাতের চিত্র। থামছে না ক্যাম্পাসের এই দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা। বস্তুত এই সংকট আকস্মিক বা সাময়িক কোনো বিষয় নয়; এর শেকড় গেঁথে রয়েছে সুদৃর অতীতে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহিংসতার ইতিহাস দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক। স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ক্যাম্পাসের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়গুলো পর্যালোচনা করলে এর ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে :১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলে সংঘটিত নৃশংস ব্রাশফায়ারে ৭ জন শিক্ষার্থী নিহত হন, যা ক্যাম্পাসের ইতিহাসে প্রথম বড় রক্তক্ষয়ী অধ্যায় বা ‘সেভেন মার্ডার’ নামে পরিচিত। ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবুজ আঙ্গিনায় এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪ জন নেতাকর্মী (সাব্বির আহমদ, আবদুল হামিদ, আইয়ুব আলী এবং আবদুল জব্বার) শহীদ হন। ১৯৯৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণ হারান ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থী-মুহাম্মদ আলাউদ্দিন, শওকত হোসেন তালুকদার ও মঞ্জুরুল কবীর। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর ফলে হলগুলোতে গণরুম, গেস্টরুম সংস্কৃতির অবসানের দাবি জোরালো হলেও তার বাস্তবায়ন আজও মেলেনি। ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর প্রথম আলো পত্রিকায় ‘‘লাশ ও খুনি তৈরি করা ছাত্ররাজনীতি শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পড়েছিলাম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতার ৫০ বছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ১৫১ জন শিক্ষার্থী রাজনৈতিক সংঘাতে খুন হন। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ জন, বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ জন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ২ জন, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং হজরত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ জন করে শিক্ষার্থী খুন হন। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে এসব পরিবারের স্বপ্ন আজ ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসেও এই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়ে ফেসবুক কমেন্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ ১০ জন আহত হওয়া এবং রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে-ক্ষমতার সাইনবোর্ড বদলালেও ক্যাম্পাসের অন্ধ ও সহিংস সংস্কৃতি বদলায় নি।
শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। অথচ কিছু কারিগর জ্ঞানচর্চাকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতার মোহে মত্ত হয়ে অন্ধ তোষামোদে গা ভাসিয়ে দিচ্ছেন। ফ্যাসিস্ট শাসনামলে একশ্রেণীর শিক্ষক লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিতে জড়িয়ে নিজেকে ধন্য মনে করতেন। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি তো প্রকাশ্যে মিডিয়াতে বলেছিলেন- ‘‘আমাকে যদি সরকারি দলের যুব সংগঠনের চেয়ারম্যান পদ দেয়া হয়, তবে ভিসির পদ ছেড়ে দেব।’’ এ কথা কোনো পাতি নেতা কিংবা কোনো ছাতি নেতার সাজে; একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির মুখ থেকে এমন অপেশাদার কথা আমরা কেউ প্রত্যাশা করি নি। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে প্রায় বিশ্ববিদ্যালয় ভিসিগুলো ছিলেন নতজানু, তেলবাজ। ফলে তাদের চোখে শিক্ষার পরিবেশ সর্বদা সুষ্ঠু ছিল। অথচ উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেমন-যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বা এমআইটি, কিংবা ইউরোরোপ ও জাপানের নামী দামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষাঙ্গন সম্পূর্ণ রাজনীতি ও পেশিশক্তিমুক্ত। সেখানে ভিসি বা শিক্ষক নিয়োগ হয় শতভাগ মেধা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং গবেষণার যোগ্যতার র্ভিত্তিতে। কোনো ছাত্রসংগঠন বা দলীয় লেজুড়বৃত্তির মাধ্যমে হল দখল বা টেন্ডারবাজির বিন্দুমাত্র সুযোগ সেখানে নেই। শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত থাকেন উদ্ভাবন, ল্যাব এবং লাইব্রেরির গবেষণায়। অথচ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালঘুলোকে বানানো হয়েছে রাজনৈতিক দলের যুব ও ছাত্র সংগঠনের গ্রুপিং ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষক রাজনীতির কুফল কত ভয়ংকর হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ গত ৬ অক্টোবর ২০২৬ রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড.মো. জাওয়াদুল হককে মব সৃষ্টি করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়। এছাড়া ৩ অক্টোবর ২০২৬ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফেসবুক পোস্টে কমেন্ট নিয়ে বিরোধের জেরে সাংংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়, যাতে সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি অডিওর কথোপকথনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আমানত হলের মসজিদের সংস্কারের ১৫ লাখ টাকার ট্রেন্ডারের কাজ হাতে নিয়ে আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধে। এ রকম ঘটনা আগে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে প্রায়ই শোনা যেত। এখন ছাত্রদলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত হচ্ছে- যা প্রমাণ করে চরিত্রের কোনো বদল ঘটেনি, কেবল সাইনবোর্ড পাল্টেছে।
যে কেউ ইচ্ছে করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে না, এর জন্য তাকে কঠোর মেধা ও ভালো ফলাফলের লড়াই পেরিয়ে আসতে হয়। যারা সেখানে পড়েন তাঁদের প্রতি বাবা,মা,ভাইবোন ও আত্মীয় স্বজনের প্রত্যাশা অনেক বেড়ে যায়। তারা সেখানে যান কেবল শিক্ষার আলোয় নিজেদের আলোকিত করতে। অথচ শিক্ষা নিয়ে নয়, কেউ কেউ সেখান থেকে ফেরেন সন্ত্রাসী, বখাটে, দাগী আসামী কিংবা হিমশীতল লাশ হয়ে। পিতার কাঁধে সন্তানের লাশের ওজন কতটা ভারি হতে পারে, তা কেবল একজন ভুক্তভোগী পিতাই জানেন। প্রজাপতির মতো ক্যাম্পাসে উড়ে বেড়ানোর বয়সে কোনো শিক্ষার্থী যেন লাশ বা দাগী আসামী হয়ে ফিরে না আসে- তা রাষ্ট্র ও সমাজকে যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতেই হবে।
শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ র্ফিরিয়ে আনতে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
১. জিরো টলারেন্স নীতি : বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং, সিট দখল, অস্ত্রবাজি এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষ শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করতে হবে।
২. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন : দলীয় বিবেচনায় ভিসি নিয়োগের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করে সম্পূর্ণ, মেধা, সততা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. ছাত্ররাজনীতির সংস্কার : দেশের সকল বিশ্ববিদ্যায়ের ক্যাম্পাসগুলোকে লেজুড়বৃত্তিক ও সন্ত্রাসী ছাত্ররাজনীতি থেকে মুক্ত করে ছাত্রকল্যাণমূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের আঁতুড়ঘর। এই হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে হলে দলদাস শিক্ষক ও সন্ত্রাসী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে মেধা ও বুদ্ধি বৃত্তির চর্চার জায়গা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ : প্রতিটি অপরাধ ও হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন নৃশংসতা চালানোর সাহস না পায়।
শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং প্রশাসনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে যেকোনো ধরনের সহিংসতা, র্যাগিং, সিট দখল বা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। ক্যাম্পাসে অস্ত্রের ঝনঝনানি চিরতরে বন্ধ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সব ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। বিশেষ করে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে ভিসি নিয়োগের পথ চিরতরে বন্ধ করে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে ভিসি নিয়োগ নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি অপরাধীকে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন, এমটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
