রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করে ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তা হিমাগারে রেখেছেন।
রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বকশি রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায়। নগরীর দুটি হিমাগারে ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন তিনি। বর্তমানে জেলায় হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মাত্র ১১-১৪ টাকায়। এ দামে আলু তুললে কেজিতে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা লোকসান হবে বলে আপাতত বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তবে সামনে লোকসান কমার সম্ভাবনাও দেখছেন না। যে কারণে আলু উত্তোলনে আগ্রহ কম তার। এ পরিস্থিতি কেবল ভুপাল চন্দ্রেরই নয়, হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করা অধিকাংশ কৃষকেরই এমন অবস্থা।
দেশের বিভিন্ন বাজারে সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী হলেও রাজধানীর খুচরা বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৫-৩০ টাকায়। এ দামে বিপাকে পড়েছেন হিমাগারে আলু রাখা চাষী ও মজুদদাররা। অনেকেই আপাতত আলু উত্তোলন বন্ধ রেখেছেন, দাম এমন থাকলে কেউ কেউ আর আলু তুলবেন না বলেও জানিয়েছেন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ ৮৫ হাজার টন আলু উৎপাদন হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি ৪০২টি হিমাগার ও ৭০৩টি অ-হিমায়িত মডেল ঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৫৭ টন, যা মোট উৎপাদনের ২৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। এর মধ্যে ২৪ লাখ ৪৪ হাজার ১৪৮ টন খাবার ও ৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯১০ টন বীজ আলু। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএসএ) হিসাবে, তাদের হিমাগারে এবার ৩৩ লাখ টনের বেশি আলু রাখা হয়েছে, যার মধ্যে এখনো ১৫ লাখ টনের বেশি মজুদ আছে। গত বছর কম দামের কারণে কৃষকরা দুই লাখ টন আলু হিমাগার থেকেই তোলেননি।
বিসিএসএর তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের গড় ব্যয় ১৬ টাকা, আর মুন্সিগঞ্জসহ অন্যান্য এলাকায় ১৯ টাকা। এর সঙ্গে কেজিপ্রতি ৬ টাকা হিমাগার ভাড়া এবং বস্তা, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ যোগ করলে বাজারজাত পর্যন্ত ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৫ টাকা। অথচ রাজধানীর খুচরা বাজারেই আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২৫ টাকায়।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রানীপুকুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করে ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তা হিমাগারে রেখেছেন।
এর মধ্যে ৩ হাজার ১৪২ বস্তা বিক্রি করে পেয়েছেন ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। কিছুদিন আগে প্রায় ২৫০ বস্তা আলু কেজিপ্রতি ১৫ টাকায় বিক্রি করেন। তার হিসাবে, হিমাগার থেকে আলু তোলাসহ খরচ হয়েছে কেজিতে ৭ টাকা। এখন দাম ১১-১৪ টাকায় নেমে আসায় অবশিষ্ট আলু থেকে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে সংশয়ে তিনি।
আতাউর রহমান বলেন, ‘লাভ দূরের কথা, উৎপাদন খরচই কতটা তুলতে পারব সেটিই ভাবছি। গত বছর ৬৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদে প্রায় ৫৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। সেই টাকাই তুলতে পারিনি। এখন পথে বসার অবস্থা।’
বদরগঞ্জের শাহজালাল ও গঙ্গাচড়ার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, ‘গত দুইদিন ধরে হিমাগার গেটে প্রকারভেদে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১১-১৪ টাকায়। হিমাগার দুটির ধারণক্ষমতা যথাক্রমে ১৫ হাজার ও সাড়ে ৯ হাজার টন; বর্তমানে সেখানে যথাক্রমে ৪০ ও ৪৮ শতাংশ আলু মজুদ রয়েছে।’
রংপুরের পীরগাছার নব্দীগঞ্জের অপু মুন্সি হিমাগারের ব্যবস্থাপক মো. রবিউল বলেন, ‘গত বছর একাধিকবার তাগাদা দিয়েও অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ে আলু তোলেননি। ফলে হিমাগার কর্তৃপক্ষ ১ লাখ ৬৬ হাজার বস্তা আলু কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এতে ২৫-৩০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।’
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, এবার জেলার ৪২টি হিমাগারে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ টন খাবার ও বীজ আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১ অক্টোবর পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২১ টন। জেলা কৃষি অফিস জানায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আগাম আলুর আবাদ হয়েছে। গত বছর এ আবাদ ছিল তিন হাজার হেক্টর; এবারো একই পরিমাণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘টানা দুই বছর আলু আবাদে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবার ৫৪ হাজার হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ গত বছরের চেয়ে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর কম হতে পারে। অতিরিক্ত আলুচাষীদের ভুট্টা ও সরিষা আবাদে উৎসাহিত করা হচ্ছে।’
একই অবস্থা রাজশাহীতেও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তাফা কামাল হোসেন জানান, গত মৌসুমে জেলায় আলুর সম্ভাব্য উৎপাদন ধরা হয়েছিল ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮০ টন। মৌসুমের শুরুতে আগের মৌসুমের মজুদ ছিল ৫৬ হাজার ৪২০ টন। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার ৪০টি হিমাগারে আলু ছিল ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৭ টন। গত মৌসুমেও হিমাগারে আলু রাখা কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনেছেন, উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ২২ টাকা হলেও গড়ে দাম পেয়েছেন প্রায় ১২ টাকা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয় জানায়, বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি সাড়ে ১৪ থেকে সাড়ে ১৬ টাকায়।
রাজশাহীর দুর্গাপুরের নিগার কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক মো. আইনাল হক বলেন, ‘বর্তমানে হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৪-১৬ টাকায়, কিন্তু ক্রেতা কম। চাষ, সংরক্ষণ ও বিক্রি পর্যন্ত কৃষকের খরচ পড়ে প্রায় ২৫ টাকা কেজি। দাম বেশি নেমে গেলে কৃষক বা ব্যবসায়ীরা অনেক সময় আলুর মালিকানা কোল্ড স্টোরেজের কাছে ছেড়ে দেন। পরে সেসব আলু খুব কম দামে হাট-বাজারে বিক্রি করা হয়।’
বগুড়ার কৃষক, হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৫ টাকা, অথচ হিমাগার গেটে বিক্রি হচ্ছে ১৪-১৬ টাকায়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছর জেলার ৫১টি হিমাগারে প্রায় ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৮৪২ টন আলু সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টন খাবার আলু বের করা হয়েছে। এখনো হিমাগারগুলোতে ২ লাখ টনের বেশি খাবার ও বীজ আলু মজুদ রয়েছে।
বগুড়ার আলুচাষী আবুল হোসেন বলেন, ‘গত বছরের মতো এবারো বাজার পরিস্থিতি নাজুক। লাভের আশায় হিমাগারে আলু রাখলেও বাজারদর উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
শিবগঞ্জের আলুচাষী আজিজুর রহমান ২০০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছেন। বস্তাপ্রতি তার খরচ ১ হাজার ৯৫০ থেকে ২ হাজার টাকা, অথচ বিক্রি হচ্ছে ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকায়। এতে প্রতি বস্তায় প্রায় ৮০০-৯০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
বগুড়ার কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, ‘দামের বিষয়টি বাজারের ওপর নির্ভর করে। আমরা আলুর বিষয়ে নিয়মিত সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ ও ঊর্ধ্বতন মহলকে জানাচ্ছি।’
অধিক ফলন হলেও আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় এবারো মুন্সিগঞ্জের আলুচাষীরা বিপাকে পড়েছেন। কৃষকদের হিসাবে, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ১৬-১৮ টাকা এবং হিমাগার, পরিবহন, শ্রমিক ও বস্তাসহ মোট ব্যয় ২৬-২৭ টাকা। অথচ বর্তমানে পাইকারিতে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৩ টাকায়। এতে কেজিতে ১৩-১৪ টাকা এবং বস্তাপ্রতি ৭৫০-৮০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ মৌসুমে মুন্সিগঞ্জে ১১ লাখ ১২ হাজার ৯৩২ টন আলু উৎপাদন হয়েছে। কৃষক ও মজুদ ব্যবসায়ীরা প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টন আলু হিমাগারে রেখেছেন। গত সপ্তাহ পর্যন্ত বীজসহ ৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৩২ টন আলু হিমাগারে ছিল।
আলু ব্যবসায়ী রশরাজ বাবু বলেন, ‘আমাদের খোঁজ কেউ নেয় না। গত বছর হিমাগারে ২২ টাকা দর টাঙানো থাকলেও ১০০-২০০ টাকা বস্তায় আলু বিক্রি করে বাড়ি ফিরেছি। আজ আলু পাইকারিতে সাড়ে ১২ টাকা কেজি বিক্রি করছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আলু নিয়ে আমাদের যা করণীয় তা লিখিতভাবে দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সরকার রফতানি বাড়াতে পদক্ষেপ নিয়েছে।’
আলুর দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা হিমাগার থেকে আলু তুলতে অনীহা দেখাচ্ছেন, এতে ক্ষতির আশঙ্কায় পড়েছেন হিমাগার মালিকরাও। চলতি বছর বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ে তাদের ব্যয় বেড়েছে। তারা কেজিপ্রতি হিমাগার ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা করার দাবি জানালেও কৃষকের লোকসান বিবেচনায় কৃষি মন্ত্রণালয় তা ৬ টাকা নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, ‘আলুর দাম ১৩ টাকায় নেমে যাওয়ায় হিমাগার থেকে আলু বের হওয়া ধীর হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৫ টাকা, তাই লোকসানের ভয়ে তারা আলু তুলছেন না। গত বছরও দুই লাখ টন আলু তোলা হয়নি। কৃষক আলু না নিলে আমরা ভাড়া পাব না, আবার পচন ঠেকাতে মেশিন চালিয়ে পরিচালন ব্যয়ও বাড়বে। সরকার কৃষককে ভর্তুকি দিক, প্রয়োজনে কিছু আলু কিনে নিক। দাম বাড়লে পুলিশ-র্যাব আসে, কমলে কেউ দেখে না।’
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বছরে আলুর চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, সর্বশেষ মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ টন; আগের মৌসুমে ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ কোটি ৬ লাখ টন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষক লোকসানে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহার বাড়ানো ও সরকারি সহায়তার পরামর্শ দিচ্ছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আলুচাষীরা বছরের পর বছর লোকসান গুনছেন। এখানে সরকার দুটো উদ্যোগ নিতে পারে। কৃষকের হিমাগার ভাড়ার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি বা শেয়ার করতে পারে। দ্বিতীয়টি আলুচাষীকে মূল্য সহায়তা দিয়ে লোকসান থেকে রক্ষা করতে পারে। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না এবং চাষে উৎসাহীও হবেন।’
সার্বিক বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলে তখন দাম কমে যায়। আমরা পণ্যভিত্তিক সঠিক চাহিদা নির্ণয়ে কাজ করছি। এর জন্যই কৃষক কার্ড। কৃষকরা বাজারের চাহিদা সম্পর্কে জানেন না। ফলে অনেক সময় চাহিদার চেয়ে তাদের উৎপাদিত পণ্য বেশি হলে বিক্রি হয় না। আলুও তেমন হয়েছে। সরকার টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি করতে চেয়েছে। তবে খোলাবাজারে দাম কম হওয়ায় মানুষ টিসিবির আলু খায়নি। সরকার চায় কৃষক তার সব পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাক। সেজন্য আমরা অঞ্চলভিত্তিক চাহিদা নিরূপণ করে ডেটাবেজ অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনে জোর দিচ্ছি।’
