কালবেলা · অর্থনীতি
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী থেকে কর আদায় সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ
১৯/১০/২০২৬

ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী, যারা প্রথাগত হিসাব খাতা বা Books of Accounts (যেমন: General Cash Book, Petty Cash Book, Ledger Book, General Journal, Sales/Purchase Book, Sales/Purchase Return Book, Statement of Profit or Loss and Other Comprehensive Income, Statement of Financial Position) সংরক্ষণ করেন না বা করতে পারেন না, তাদের কাছ থেকে কর আদায় করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের আয়কর আইন, ২০২৩ এবং এনবিআরের (NBR) হালনাগাদ কৌশল ও ডিজিটাল অটোমেশনের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থার সমস্যা, সরকারের চ্যালেঞ্জ, সমাধান এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা-এই ৪টি মূল বিভাগের অধীনে কিছু সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট আলোচনা করা হলো:
১ম বিভাগ: সরকারের প্রধান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জসমূহ
১. বিশাল ক্যাশ-ভিত্তিক অর্থনীতি
• বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের খুচরা বাজারের সিংহভাগ লেনদেন এখনো নগদ টাকায় (Cash Transaction) ঘটে। যখন একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সব কেনাবেচা নগদে করেন, তখন সরকারের কাছে তার কেনাবেচার কোনো পেপার ট্রেইল বা ডিজিটাল প্রমাণ থাকে না।
• উদাহরণ: ঢাকা বা চট্টগ্রামের একটি মুদি দোকানে দৈনিক ৩০,০০০ টাকা বিক্রি হলেও তার কোনো ডিজিটাল রেকর্ড না থাকায় প্রকৃত রাজস্ব গোপন করা সহজ হয়।
২. এনবিআরের জনবল ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা
• বিশ্লেষণ: দেশে কোটি কোটি ক্ষুদ্র ও খুচরা দোকানদার রয়েছেন। কিন্তু রাজস্ব বোর্ডে (NBR) পর্যাপ্ত কর পরিদর্শক বা এনফোর্সমেন্ট অফিসার নেই, যারা প্রতিটি বাজারে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসায়ীদের লেনদেন বা আকার তদারকি করবেন।
• উদাহরণ: কেবল একটি বড় পাইকারি বাজারেই (যেমন: কারওয়ান বাজার বা খাতুনগঞ্জ) হাজার হাজার ছোট দোকান রয়েছে, যেখানে ম্যানুয়ালি ট্যাক্স অফিসার পাঠিয়ে অ্যাসেসমেন্ট করা অবাস্তব।
৩. ট্রেড লাইসেন্স ও ট্যাক্স নেটওয়ার্কের মধ্যে ডাটা ইন্টার-অপারেবিলিটির অভাব
• বিশ্লেষণ: স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ) থেকে ইস্যুকৃত ট্রেড লাইসেন্সের ডাটাবেজের সাথে এনবিআরের সেন্ট্রাল টিআইএন (TIN) বা ট্যাক্স ডাটাবেজের সরাসরি ও আধুনিক ডিজিটাল সংযোগ শতভাগ তৈরি হয়নি।
• উদাহরণ: একজন ব্যবসায়ী ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ১০ বছর ধরে ব্যবসা করলেও টিআইএন (TIN) না থাকায় রাজস্ব বিভাগ তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থেকে যায়।
৪. ছোট ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও অডিট ভীতি
• বিশ্লেষণ: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি বড় আতঙ্ক হলো- একবার ট্যাক্স ফাইলে বা টিআইএনে নাম লেখালে প্রতি বছর কর অফিসের অডিট, অনাকাঙ্ক্ষিত অডিট নোটিশ ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। প্রথাগত হিসাব না থাকায় তারা অতিরিক্ত কর দাবির বা হয়রানির আশঙ্কায় রাজস্ব নেটে ঢুকতে চান না।
২য় বিভাগ: কর আদায়ের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিগুলো
১. আনুমানিক নির্ধারিত কর ব্যবস্থা
• বিশ্লেষণ: যখন অডিট করার মতো কোনো ক্যাশ বই বা হিসাবপত্র থাকে না, তখন দোকানের ভৌগোলিক অবস্থান (যেমন: ঢাকা/চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা শহর বা উপজেলা) এবং ব্যবসার আনুমানিক আয়তনের ওপর ভিত্তি করে একটি নির্দিষ্ট একমুঠো বা ফ্লাট ট্যাক্স (Flat/Lump-sum Tax) ধার্য করা হয়।
• উদাহরণ: জেলা শহরের একটি মাঝারি কাপড়ের দোকানদার হিসাবপত্র না দেখালেও বছরে এককালীন ৫,০০০ টাকা ‘ফ্ল্যাট ট্যাক্স’ জমা দিয়ে সরাসরি ট্যাক্স সার্টিফিকেট বা PSR সংগ্রহ করতে পারেন।
২. টার্নওভার ট্যাক্স এবং মিনিমাম ট্যাক্স সিস্টেম (ধারা ১৬৩ অনুযায়ী টার্নওভার কর)
• বিশ্লেষণ: আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ ধারা অনুযায়ী, হিসাবপত্র না থাকা সত্ত্বেও মোট কেনাবেচা বা বিক্রয়লব্ধ অর্থের (Gross Receipts) ওপর নির্দিষ্ট হারে (যেমন: ০.২৫% থেকে ১%) ন্যূনতম কর ধার্য করা যায়। এখানে লাভের হিসাব দেখতে হয় না।
• উদাহরণ: একজন পার্টস ব্যবসায়ীর বাৎসরিক মোট ক্যাশ ও ডিজিটাল বিক্রি (Turnover) ৪০ লাখ টাকা। ০.২৫% হারে তাঁর দেয় ন্যূনতম কর দাঁড়ায় ১০,০০০ টাকা।
৩. উৎসে কর সংগ্রহ
• বিশ্লেষণ: সরাসরি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পেছনে না ঘুরে সাপ্লাই চেইনের মূল পয়েন্টে (কোম্পানি, হোলসেলার বা ইম্পোর্টার) কর কেটে রাখা হয়। ছোট ব্যবসায়ীরা যখন বড় পাইকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য কেনেন, তখনই ইনভয়েসে ট্যাক্স যোগ করে নেওয়া হয়।
• উদাহরণ: একটি ছোট ফার্মেসি যখন কোনো বড় ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারারের কাছ থেকে ২ লাখ টাকার ওষুধ কেনে, তখন ইনভয়েসেই ১% Advanced Income Tax (AIT) কেটে নিয়ে চালান ইস্যু করা হয়।
৪. ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট ও এমএফএস ট্র্যাকিং/ বাংলা কিউআর
• বিশ্লেষণ: মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট) এবং ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ের (Bangla QR) মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা ডাটা এনালিটিক্সের মাধ্যমে ব্যবসায়ীর বাৎসরিক মোট বেচাকেনার স্কেল নির্ধারণ করা সম্ভব।
• উদাহরণ: একজন ফল বিক্রেতা কোনো খাতা রাখেন না, কিন্তু তার বাংলা কিউআর ও মার্চেন্ট বিকাশে বছরে ৪৫ লাখ টাকার লেনদেন জমা হলে রাজস্ব বোর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার টার্নওভার স্কেল সনাক্ত করতে পারে।
৩য় বিভাগ: সুনির্দিষ্ট সমাধানগুলো
১. এক-পাতার অটোমেটেড ‘ই-রিটার্ন’ ও অডিট-মুক্ত গ্যারান্টি
• বিশ্লেষণ: জটিল লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং ব্যালেন্স শিট প্রস্তুতের ঝামেলা বাদ দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আয়কর ই-রিটার্ন পোর্টালে ১টি সহজ পাতার ইন্টারফেস চালুকরণ এবং অডিট-মুক্ত ‘নো-কোয়েশ্চেন আস্কড’ গ্যারান্টি প্রদান করা।
• উদাহরণ: একজন মুদি দোকানদার এনআইডি দিয়ে পোর্টালে ঢুকে কেবল দোকানের নাম ও ঠিকানা দিয়ে নির্ধারিত ৫,০০০ টাকা বিকাশ বা চালানে জমা দিয়ে তাৎক্ষণিক অটো-জেনারেটেড ট্যাক্স ক্লিয়ারেন্স পাবেন।
২. থার্ড-পার্টি ডাটা ক্রস-ম্যাচিং
• বিশ্লেষণ: স্থানীয় পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স ডাটাবেজ, ডেসকো/পল্লী বিদ্যুতের বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সংযোগ মিটার (Commercial Electricity Meter), এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ডাটা এনবিআরের এনআইডি সার্ভারের সাথে যুক্ত করা।
• উদাহরণ: কোনো দোকানের কমার্শিয়াল বিদ্যুৎ বিল প্রতি মাসে গড়ে ১৫,০০০ টাকা আসলে অ্যালগরিদম থেকেই ধরে নেওয়া যায় ব্যবসাটির বাৎসরিক টার্নওভার কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকার ওপরে।
৩. ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন পার্টনারশিপ ও স্পট অ্যাসেসমেন্ট মেলা
• বিশ্লেষণ: আলাদাভাবে কোটি কোটি ছোট দোকানির কাছে না গিয়ে বিভিন্ন ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন (যেমন: দোকান মালিক সমিতি, রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি)-র সাথে বসে ক্যাটাগরিভিত্তিক সহজ করহার নির্ধারণ করা এবং বাজারে বাজারে 'স্পট ট্যাক্স ক্যাম্প' পরিচালনা করা।
• উদাহরণ: নিউমার্কেট বা মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাথে আলোচনা করে দোকান সাইজ অনুযায়ী (যেমন: ১০০ স্কয়ার ফিট = ৫,০০০ টাকা) নির্ধারণ করে ১ দিনের মেলায় তাৎক্ষণিক ট্যাক্স স্লিপ প্রদান করা।
৪. ডিজিটাল ও ক্যাশলেস পেমেন্টে কর রেয়াত
• বিশ্লেষণ: নগদ লেনদেনের বদলে ডিজিটাল উপায়ে (Bangla QR বা ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড) পেমেন্ট গ্রহণে উৎসাহিত করতে বিক্রেতাকে আয়করে নির্দিষ্ট শতাংশ রেয়াত (Tax Rebate) বা ছাড় সুবিধা প্রদান করা।
• উদাহরণ: এনবিআর নীতি নির্ধারণ করতে পারে যে, কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি তার লেনদেনের অন্তত ৭০% ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন করেন, তবে তার ধার্যকৃত ফ্ল্যাট ট্যাক্সে ১০% বিশেষ রেয়াত দেওয়া হবে।
৪র্থ বিভাগ: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও আধুনিক কৌশল
১. ই-ইনভয়েসিং ও স্মার্ট পিওএস
• ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: খুচরা ও পাইকারি পয়েন্টে এনবিআরের কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে যুক্ত স্মার্ট পয়েন্ট অফ সেলস (POS) বা ই-ইনভয়েসিং মোবাইল অ্যাপ বাধ্যতামূলক করা। এতে হিসাবপত্র না রাখলেও প্রতিটি কেনাবেচা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি সার্ভারে রেকর্ড হবে।
উদাহরণ: একটি মাঝারি সাইজের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বারকোড স্ক্যান করে ক্যাশ মেমো দেওয়ার সাথে সাথেই লেনদেনের বিবরণী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এনবিআর-ইএফডিডিএমএস (EFDDMS) বা ইনভয়েস সিস্টেমে জমা হয়ে যাবে।
২. পলিসি ও রাজস্ব প্রশাসনের পৃথকীকরণ
• ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: এনবিআরের রাজস্ব নীতি প্রণয়ন বিভাগ এবং রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম পৃথক করায় নীতিগুলো আরও ব্যবসাবান্ধব, স্বচ্ছ এবং জটিলতামুক্ত হবে। ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উপযোগী দীর্ঘমেয়াদী কর নীতি গঠন সহজ হবে।
৩. ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্ম উইথহোল্ডিং
• ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় (Facebook/Instagram) হিসাবপত্র না রেখে ব্যবসা করা হাজার হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পেমেন্ট সাইকেল কুরিয়ার সার্ভিস (যেমন: পাঠাও, স্টিডফাস্ট, রেডক্স) বা ডিজিটাল গেটওয়ের সাথে যুক্ত করা।
• উদাহরণ: একজন এফ-কমার্স উদ্যোক্তা যখন কুরিয়ারের মাধ্যমে ক্যাশ-অন-ডেলিভারিতে (COD) পণ্য পাঠাবেন, কুরিয়ার কোম্পানি পেমেন্ট রিফান্ড করার সময়ই ০.৫% উৎসে কর কেটে রেখে বাকি টাকা তার ব্যাংক বা MFS-এ পাঠাবে।
সারসংক্ষেপ
হিসাবখাতা বা Books of Accounts না রাখা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের থেকে সফলভাবে কর আদায়ের মূল কৌশল হলো-জটিল অডিট ব্যবস্থা পুরোপুরি পরিহার করা, নির্দিষ্ট বা টার্নওভারভিত্তিক ফিক্সড ট্যাক্স (Presumptive Tax) ব্যবস্থা চালু রাখা এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ও আধুনিক ডাটা-ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে রাজস্ব প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করে তোলা।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗