কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি আগামী দুই দশকে বিশ্ব অর্থনীতি ও সমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁর মতে, এই প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে কর্মসংস্থানের ধরন বদলে যাবে, বহু প্রচলিত পেশায় মানুষের ভূমিকা কমতে পারে এবং জীবনযাত্রার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। তবে এই রূপান্তর সবার জন্য সমান সুফল বয়ে আনবে না।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ৭০ বছর বয়সী বিল গেটস বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অর্থনীতিতে প্রবেশের ফলে সমাজের একাংশ উপকৃত হলেও অন্যদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে বিভিন্ন দেশ ও সমাজকে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করতে হতে পারে।
গেটসের ধারণা, এই পরিবর্তনের সময়কাল প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তবে এটিকে নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখছেন না তিনি। প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি, এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং সরকার ও সমাজের প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে এই সময়সীমা কমতে বা বাড়তে পারে।
বিল গেটসের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মানুষের মতো দেখতে রোবটের উন্নতির ফলে ভবিষ্যতে এমন অনেক কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করা সম্ভব হবে, যেগুলোর জন্য এখন মানুষের শ্রম ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। বাড়ি নির্মাণ, খাদ্য উৎপাদন এবং অস্ত্রোপচারের মতো জটিল কাজেও যন্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে।
এতে পণ্য ও সেবা উৎপাদনের ব্যয় কমার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘাটতি হ্রাসের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়লেই যে সমাজের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে, এমনটা মনে করেন না তিনি।
গেটসের ধারণা, মানুষের জীবনে এমন কিছু কাজ রয়েছে, যেগুলো প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে করা সম্ভব হলেও মানুষ নিজেই করতে পছন্দ করবে। শিশুর যত্ন নেওয়া, রান্না করা, শিল্পচর্চা এবং খেলাধুলার মতো কার্যক্রমে মানুষের ব্যক্তিগত আগ্রহ ও অংশগ্রহণের গুরুত্ব বজায় থাকতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক দিক তুলে ধরে গেটস বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্য সুফল দিতে পারে। রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসাসেবার উন্নতি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহারে প্রযুক্তিটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে এর দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকার ও সমাজ এখনো যথেষ্ট প্রস্তুতি নিতে পারেনি বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। বিশেষ করে সাইবার হামলা এবং জীববৈজ্ঞানিক হুমকি মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি মোকাবিলার দায়িত্ব শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে ছেড়ে দিলে চলবে না। সরকার, নীতিনির্ধারক, গবেষক এবং সমাজের অন্যান্য অংশীজনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি, যথাযথ নীতিমালা এবং শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
বিল গেটস সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় রূপান্তরের সময় তৈরি করতে পারে। উৎপাদনব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে এই প্রযুক্তির প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
তবে এই পরিবর্তন কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তির সুফল যেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব যেন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা নিশ্চিত করাই হবে আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের জন্যও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পাশাপাশি কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে মানুষের জীবনকে সহজ করবে, নাকি বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা বাড়াবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের নীতি ও প্রস্তুতির ওপর।
-20261024041334.jpg&w=1440&q=75)