স্ট্রোক মস্তিষ্কের একটি গুরুতর জরুরি অবস্থা। মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে বা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। এতে মস্তিষ্কের কোষ প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও গ্লুকোজ পায় না এবং দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে স্থায়ীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি, পক্ষাঘাত, কথা বলার ক্ষমতা হারানো, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।
পুরুষদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ স্ট্রোক। সাধারণত ৬৫ বছরের বেশি বয়সিদের ঝুঁকি বেশি হলেও যেকোনো বয়সেই এটি হতে পারে। নারীদের তুলনায় পুরুষদের কম বয়সে স্ট্রোক হওয়ার প্রবণতা বেশি। তবে আশার কথা হলো, প্রায় ৮০ শতাংশ স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্ট্রোক হয় যেভাবে
স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। প্রথমটি ইস্কেমিক স্ট্রোক। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহকারী রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে এটি হয়। কখনো শরীরের অন্য অংশে তৈরি হওয়া রক্তের জমাটও মস্তিষ্কে পৌঁছে রক্তপ্রবাহ আটকে দিতে পারে। এ ছাড়া রক্তনালিতে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে পথ সরু হয়ে গেলেও এ ধরনের স্ট্রোক হতে পারে। মোট স্ট্রোকের প্রায় ৮০ শতাংশই ইস্কেমিক।
দ্বিতীয়টি হেমোরেজিক স্ট্রোক। মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে গেলে রক্তক্ষরণ হয় এবং আশপাশের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চ রক্তচাপ ও রক্তনালির দেয়ালে দুর্বল অংশ তৈরি হয়ে ফুলে ওঠা অ্যানিউরিজম এ ধরনের স্ট্রোকের প্রধান কারণ। এ স্ট্রোক তুলনামূলক কম হলেও এর পরিণতি গুরুতর হতে পারে।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে
মুখ, হাত বা পায়ের এক পাশ দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা অবশ লাগা।
এক বা দুই চোখে ঝাপসা দেখা কিংবা দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া।
কথা বলতে সমস্যা হওয়া বা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা।
কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা।
ভারসাম্য হারানো বা হাঁটতে গিয়ে টালমাটাল হওয়া।
স্ট্রোকের লক্ষণ সহজে মনে রাখতে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ‘ফাস্ট’ পদ্ধতি অনুসরণের পরামর্শ দেয়।
‘ফাস্ট’ পদ্ধতির লক্ষণগুলো হলো—
এফ (ফেস): মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া।
এ (আর্ম): এক হাত দুর্বল হয়ে পড়া বা তুলতে না পারা।
এস (স্পিচ): কথা জড়িয়ে যাওয়া বা স্পষ্টভাবে কথা বলতে সমস্যা হওয়া।
টি (টাইম): এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়া।
লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে হবে।
ঝুঁকি কমাতে করণীয়
উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান ও অতিরিক্ত ওজন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও কিছু বংশগত বৈশিষ্ট্যও ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা জরুরি। সপ্তাহের অধিকাংশ দিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম, শাকসবজি ও ফলমূলসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং ধূমপান ছাড়ার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্ট্রোক প্রতিরোধে অ্যাসপিরিন খাওয়া উচিত নয়।
কখনো স্ট্রোকের আগে অল্প সময়ের জন্য একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিয়ে আবার সেরে যায়। একে ক্ষণস্থায়ী ইস্কেমিক অ্যাটাক বা মিনি স্ট্রোক বলা হয়। লক্ষণ চলে গেলেও এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে। তাই এমন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
স্ট্রোকের চিকিৎসা এর ধরন ও রোগী কত দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছেছেন, তার ওপর নির্ভর করে। ইস্কেমিক স্ট্রোকের কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রক্তের জমাট গলানোর ওষুধ দেওয়া যায়। তাই দ্রুত লক্ষণ শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়াই জীবন বাঁচানো ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সূত্র: ওয়েবএমডি