হবিগঞ্জের সড়কে চলাচলকারী নিবন্ধিত যানবাহনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশেরই বৈধ ফিটনেস সনদ নেই। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, জেলায় নিবন্ধিত ৩১ হাজার ৮৬১টি মোটরযানের মধ্যে ১০ হাজার ৫০৪টির ফিটনেস নেই। হিসাব অনুযায়ী, মোট নিবন্ধিত যানবাহনের ৩৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ ফিটনেসবিহীন।
ফিটনেসবিহীন এসব যানবাহনের অনেকগুলোই প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ চালক এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা সড়কে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে এসব যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিআরটিএর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের তালিকায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে অটোরিকশা। জেলায় ৯ হাজার ৫৩৯টি অটোরিকশার বৈধ ফিটনেস নেই। এ ছাড়া ১৭৩টি হিউম্যান হলার, ১৭৩টি পিকআপ, ১৩১টি ট্রাক ও ৯৩টি বাস ফিটনেসবিহীন অবস্থায় রয়েছে। তালিকায় রয়েছে অটোটেম্পু, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। এমনকি রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত ১০টি অ্যাম্বুলেন্সেরও বৈধ ফিটনেস নেই।
জেলার মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও শহরের বিভিন্ন সড়কে এসব যানবাহনের একটি অংশ নিয়মিত চলাচল করছে। শহর ও উপজেলা পর্যায়ে যাত্রী পরিবহনে অটোরিকশার ব্যাপক ব্যবহার থাকায় ফিটনেসবিহীন অটোরিকশা চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ যাত্রী ও পথচারীরা। তাঁদের অভিযোগ, অনেক পুরোনো যানবাহন নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করছে। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এসব যানবাহনের কোনো কোনোটি চলার পথে বিকল হয়ে পড়ে। এতে যানজট ও ভোগান্তি তৈরি হয়।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিন বলেন, হবিগঞ্জে চলাচলকারী অনেক যানবাহনেরই ফিটনেস নেই। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে গাড়িগুলো পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। অনেক গাড়ির ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার ও লাইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি রয়েছে। এসব ত্রুটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আজমিরীগঞ্জের যাত্রী শিহাব মিয়া বলেন, ইদানীং হবিগঞ্জে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন। রাতে অনেক গাড়িতে হেডলাইট ও সিগন্যাল লাইট থাকে না। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কারণে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। প্রায় প্রতিটি দুর্ঘটনায় দেখা যায়, যানবাহনগুলো ধুমড়ে-মুচড়ে গেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জাল সোহেল বলেন, চিকিৎসকদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ পরিবেশদূষণ। পুরোনো যানবাহন শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে না, সেগুলো থেকে অতিরিক্ত কালো ধোঁয়াও নির্গত হচ্ছে। এতে বায়ুদূষণের পাশাপাশি সড়কে চলাচলকারী মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শহর ও ব্যস্ত সড়কগুলোতে অতিরিক্ত ধোঁয়া পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে যানবাহনের চালক ও মালিকদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোরও দায় রয়েছে। কারণ, এসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। পাশাপাশি চালকদের দক্ষতা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলাও সড়ক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
এ বিষয়ে বিআরটিএ হবিগঞ্জের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত) মো. আব্দুর রশিদ বলেন, অনুমোদিত মোটরযানের ফিটনেসের মেয়াদ শেষ হলে বিআরটিএর সিস্টেম থেকে সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসএমএস পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে তাঁরা ফিটনেস নবায়নের সুযোগ পান। যারা ফিটনেস নবায়ন করছেন না, তাঁদের যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হবিগঞ্জের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর রেজাউল করিম খান বলেন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। এর ফলে অনেক যানবাহনের মালিক ও চালক নিয়মিত ফিটনেস নবায়ন করছেন। এটি অভিযানের ইতিবাচক ফল। কেন্দ্রীয়ভাবে অভিযান জোরদারের নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী অভিযান আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে।
