রাজধানীর ভাটারা থানার পুলিশ হাউজিং-১-এ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজির ভাড়া দেওয়া আলোচিত সেই বাড়িতে প্রায়ই ডিজে পার্টির আড়ালে মাদকের আসর বসানো হতো। প্রতি মাসে অন্তত ২০ থেকে ২২ দিন এ ধরনের আয়োজন থাকত। এই পার্টিতে আসা তরুণ-তরুণীদের জানানো হতো
বাড়িটি পুলিশের ডিআইজির। এখানে পুলিশ অভিযান তো দূরে থাক, উল্টো পুলিশ নিরাপত্তা দেবে। এই আশ্বাস পেয়ে নির্ভয়ে তারা পার্টিতে যোগ দিতেন, রাত্রিযাপন করতেন। মাদক সেবন আর নেচেগেয়ে রাতভর আমোদ-ফুর্তি করে সময় পার করতেন। মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ওই বাড়িতে মাদকবিরোধী অভিযানে ৮৫ জনকে আটকের পর এ ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় এ রকম আরও বাড়ির সন্ধান পেয়েছে। যেখানে ডিজে পার্টি বা জন্মদিনের পার্টির নামে মাদকের আসর বসানোর অভিযোগ রয়েছে।
মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের তিনতলা ওই বাড়ি থেকে আটক করা ৮৫ তরুণ-তরুণীকে বিভিন্ন মেয়াদে মোবাইল কোর্টে সাজা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের উত্তরা বিভাগের ডিসি মো. ইলিয়াস কবির আমাদের সময়কে বলেছেন, আটকদের মধ্যে প্রত্যেক পুরুষকে এক মাসের জেল এবং এক হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ী থাকলে আরও এক মাসের জেল দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আটক প্রত্যেক নারীকে ১৫ দিনের জেল ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক নারী-পুরুষ ১৯ অক্টোবর রাত ৯টায় ওই বাড়িতে প্রবেশ করেন। ডিজে পার্টিতে অংশ নেওয়ার আগে তারা ইংরেজিতে লেখা একটি বার্তায় আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। বার্তাটি হলো— হ্যালো! আগামী সোমবার, ১৯ অক্টোবর, আমরা একটি হাউস পার্টি ও রেভ-এর আয়োজন করছি! এটি একটি ব্যক্তিগত এবং শুধু আমন্ত্রিতদের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠান, তাই এতে অংশগ্রহণের জন্য আগেভাগে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক।
রাত ৯টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত একটানা মিউজিক চলবে— পুরো রাত গান, নাচ আর দারুণ আমেজে মেতে ওঠার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান! পার্টিটি একটি ট্রিপ্লেক্স (তিন তলা বিশিষ্ট) বাড়িতে অনুষ্ঠিত হবে। বাড়িটির মালিক একজন পুলিশ ডিআইজি, তাই এখানে কোনো ধরনের পুলিশি অভিযানের ভয় নেই; বরং আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত থাকবেন। একটি দুর্দান্ত রাতের অভিজ্ঞতার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগ দিন! আপনার বন্ধুদের সঙ্গেও বিষয়টি শেয়ার করতে পারেন। আসনসংখ্যা সীমিত, তাই দ্রুত রেজিস্ট্রেশন করে ফেলুন। পুলিশের তদন্তকারীরা এখন জানার চেষ্টা করছেন বার্তাটি কবে পাঠানো হয়েছিল, কে পাঠিয়েছিলেন, কীভাবে পাঠিয়েছিলেন।
মাদকবিরোধী অভিযানে আটক নারী-পুরুষের মধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা, প্রশাসনের কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, ব্যাংকারসহ উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা রয়েছেন। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীও রয়েছেন। এদের কেউ প্রথমবার এই বাড়ির ডিজে পার্টিতে যোগ দিয়েছেন, কেউ নিয়মিত আসতেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাড়িটি অনলাইনে ‘এয়ারবিএনবি’ অ্যাপসের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। বাড়িটি দেখভালের জন্য মাহবুব আলম নামের একজন কো-হোস্টও নিয়োগ দেন আব্দুল্লাহ আল জহির। পুলিশ তাকেসহ আরও তিনজন সহকারী কো-হোস্ট সাদমান রিফাত, নাইমুর রহমান এবং পরম গুহকে আটক করে। তারা বাড়িতে আয়োজন করা পার্টির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। আরও তথ্য জানতে তাদের কাছ থেকে জব্দ করা ৩টি মোবাইল ফোন ফরেনসিক করবে পুলিশ। অন্যদিকে আটক নারী-পুরুষের প্রত্যেকের কাছে পাওয়া গেছে আইফোনসহ দামি মোবাইল ফোন। বাড়ির সামনে পুলিশ বিলাসবহুল ৬টি গাড়ি পেয়েছে।
বাড়িটিতে মোট ৬টি রুম। এর মধ্যে পাঁচটি রুম অনলাইনে বুকিংয়ের মাধ্যমে ভাড়া দেওয়া হতো। একেকটি রুম ১০ জনে ভাড়া নেয়। এর অতিরিক্ত মানুষ আসলে জনপ্রতি ৬০০ টাকা বাড়তি ফি গুনতে হতো তাদের। ৫টি রুম রাত ৯টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৮ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো। প্রতি মাসে বাড়িটিতে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো।
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা ইলিয়াস কবির জানান, বাড়িটিতে উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা এসে মাদক সেবনের পাশাপাশি ডিজে পার্টির নামে এখানে অসামাজিক কর্মকাণ্ড চালাত।
এদিকে পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জহিরের বাড়ির পার্টিতে কারা নিয়মিত আসতেন তা জানতে বাড়িটি থেকে জব্দ করা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে গোয়েন্দা পুলিশ। তারা তথ্য পেয়েছেন তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা ওই বাড়ির পার্টিতে প্রায়শই যোগ দিতেন। মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জহিরকে সংযুক্ত করা হয়। এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে তার ভূমিকা।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা, তিনশ ফিট এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের আরও বাড়ি রয়েছে। যেখানে ডিজে পার্টির আড়ালে মাদক সেবন ও অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ ওইসব বাড়িতে নজরদারি শুরু করতে যাচ্ছে।
